অবশেষে সাক্ষাত ঘটিলো : এম এ আখের

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব এম এ আখের

এম এ আখের: আমি খুব প্রথম থেকেই সাবধান ছিলাম। ২০২০ সালের মার্চ মাসের ৮ তারিখে আমরা একটা সভায় ছিলাম। আমার পাশে বসেছিলেন মেহেদি মোশাররফ ভূঁইয়া। তিনি হঠাৎ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। জানালেন, দেশে করোনাক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে।

আমরা প্রত্যেকে পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। যেনো বিনা মেঘে বজ্রপাত। অবশ্য ততোদিনে এয়ারপোর্টে কোয়ারেন্টাইন বিরোধী জনৈক ইতালী প্রবাসীর অশ্লীল কথাবার্তা ও যুদ্ধংদেহী আচরণ টিভি’তে দেখেছি। বিপদ যে অত্যাসন্ন, তাও প্রায় মেনে নিয়েছি।

২০২০ সালের মার্চের ১৭ তারিখ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শেষ সপ্তাহ থেকে সরকারি-আধাসরকারি-অসরকারি সকল দপ্তর বন্ধ করে দেয়া হলো। আমরা একরকম গৃহবন্দী হলাম। আমি এমনকি ছাদেও যেতাম না। যদি করোনাক্রান্ত হই! পরে অবশ্য ছাদে প্রতিদিন ৪০ মিনিট করে হাঁটাহাঁটি করতে থাকলাম।

আমাদের পরিচিত দু’একজন আক্রান্তের সংবাদ পেতে থাকলাম। প্রতিদিন টিভিতে সংবাদ সম্মেলন করে আক্রান্তের সংখ্যা জানানো শুরু হলো। ঢাকার এলাকাভিত্তিক আক্রান্তের তালিকা দেখতাম। দেখতাম, বসুন্ধরা এলাকায় একজন দু’জন করে আক্রান্তের সংখ্যা ২০-২৫ জন হয়ে গেলো। সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আতঙ্কও বৃদ্ধি পেতে থাকলো।

অবশেষে ৬৭ দিন পর অফিস খুললো। আমরা রোস্টার করে দাপ্তরিক কার্যাদি সম্পাদন করতে থাকলাম। তবে, সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে নিয়মিত অফিস করতে শুরু করলাম। মার্চ থেকে ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে গ্রামে পাঠিয়ে দিলাম। বিকাশে ওর বেতন পাঠিয়ে দিতে থাকলাম। অক্টোবরও যখন স্কুল-কলেজ খুললো না, ড্রাইভারকে অন্যত্র চাকুরি নিতে বললাম। আমার ঘনিষ্ট এক বন্ধু তাকে পূর্ণবেতনে চাকুরিতে ন্যস্ত করলেন।

আমি ঘরে এবং বাইরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করলাম। ডাবল মাস্কের ওপর কাপড়ের মাস্ক পরিধান এবং মাথায় হেয়ারক্যাপ পরে অফিসে যেতে থাকলাম। নিজের রুমে কাউকে অ্যালাউ করতাম না। ফাইলপত্র সহকারিদের ডেস্কে গিয়ে স্বাক্ষর করতাম। সকালে বাসায় খেয়ে যেতাম। দুপুরে বক্স থেকে শুকনো খাবার খেয়ে সে এঁটো বক্স বাসায় এনে ধোয়ার ব্যবস্থা হতো।

দপ্তরে সাধারণত অন্য কারও কক্ষে যেতাম না। জরুরি দরকার ইন্টারকমে সারা হতো। কিন্তু সিনিয়রগণ ডেকে নিলে সম্ভব ক্ষেত্রে আসন গ্রহণ করতাম না। যদি চেয়ার থেকে সংক্রমিত হই- এ ভয়ে। সভা-অনুষ্ঠানে সরবরাহকৃত খাদ্য খাবার তো দূরের কথা হাতও দিতাম না।

নিজে অন্যের গাড়িতে উঠতাম না। অন্যকেও আমার গাড়িতে উঠাতাম না। গাড়ির সিটে ১৪টি উন্নত মানের কাপড়ের মাস্ক ভিন্নভিন্ন খামের মধ্যে থাকতো। পালাক্রমে একেকদিন একেকটা পরিধান করতাম। যেনো ধুতে না হয়। শার্ট-প্যান্টও তাই করলাম। সাত সেট শার্ট-প্যান্ট পালাক্রমে পরিধান করতাম। অবশিষ্ট দিনগুলোতে সেগুলো কোয়ারেন্টাইনে থাকতো।

দপ্তরের ন্যায় বাসায়ও ভিজিটর নিষিদ্ধ করলাম। জরুরি দরকারে আত্মীয়-স্বজন এলে ছাদে কিংবা গ্যারাজে সাক্ষাত করতাম। এতে কিছু আত্মীয় ভুল বুঝলেন। কেউ কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করলো। আমি কিন্তু কঠোরই ছিলাম।

২০২১-এর শুরু পর্যন্ত মোটামুটি এভাবে চললাম। ফেব্রুয়ারি মাসে আমি লিয়েন বাতিল করলাম। সরকারি চাকুরিতে জয়েন করলাম। মার্চে আমার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং হলো। এরমধ্যে অবশ্য প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছি। মন্ত্রণালয়ে দেখলাম, দু’একজন ছাড়া সহকর্মীগণ আমার মতো ততোটা সিরিয়াস নন। অবশ্য টিকা নেবার কারণে অনেকে সাহসীও হয়ে উঠেছেন।

কোরবানির ঈদের পর আমাদের প্রতিবেশী একটি যুবক ডেল্টা ভ্যারাইটিতে আক্রান্ত হলো। আমরা আরও সাবধান হলাম। অবশ্য ততোদিনে আমরা ডাবল ডোজ টিকা সম্পন্ন করেছি। কিন্তু সন্তানদের তো টিকা দেয়া হয়নি! ফলে, সাবধানতা অব্যাহত থাকলো।

২০২১ সালের শেষ দিকে এসে একে একে ছেলে মেয়েরা ডাবল ডোজ টিকা পেলো। মেয়ের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। সাহস করে রাঙামাটিতে বেড়াতে গেলাম। আমি অফিসে বিভিন্ন মিটিংয়ের নাস্তা গ্রহণ শুরু করলাম। মাঝে মধ্যে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় যাওয়া শুরু করলাম। মাস্কে শিথিলতা গ্রহণ করলাম।

এরমধ্যে চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি সোমবার একটা লাইট ডিনারে গেলাম। এর আগেও বেশ কয়েকবার বাইরে ডিনার করেছি। আগের সপ্তাহে এমনকি, দিনাজপুর ট্যুরে যাওয়া-আসায় এরিস্টোক্র্যাটে দু’বার আহার করেছি। ফলে, জীবন স্বাভাবিকভাবে চলছিলো।

এ কারণে বন্ধুদের আড্ডায় খুব স্বাভাবিক ছিলাম। তিনবন্ধু একসাথে ডিনার করলাম। স্মোক চিকেন আর পরোটা, সাথে সামান্য পানীয় ছিলো। খাবার টেবিলে আমরা তিন বন্ধুর বাইরে কেউ ছিলেন না। ফলে মাস্ক দূরে থাকলো।

মঙ্গলবার স্বাভাবিক অফিস করলাম। বাসায়ও স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করলাম। অফিসে খুব স্বাভাবিক ছিলাম। নিজ কক্ষে মাস্ক খুলে রাখলেও রুম থেকে বাইরে গেলে সার্বক্ষণিক ডাবল মাস্ক নিশ্চিত করলাম।

কিন্তু সমস্যা হলো বুধবার। সকালে স্নান ও নাস্তা সেরে দাপ্তরিক পোষাক পরিধান করছি। অফিসে যাবো। এমন সময় পেটে মোচড় দিলো। ভীষণ অস্বস্তিকর সে অবস্থা! বেশ কয়েকবার টয়লেটে গেলাম। খুব স্বাভাবিক টয়লেট হলো। কিন্তু পেটের মোচড় কমলো না।

অফিসে যেতে পারলাম না। পরদিন বৃহস্পতিবারও একই অবস্থা। সেদিন সন্ধ্যায় জ্বর আসলো। সামান্য, ১০০ ডিগ্রির নিচে। রাতে একটা প্যারাসিটামল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। রাতে খুব সুন্দর ঘুম হলো। মনে করলাম, সোমবারের খাবারে ফুড পয়েজনিং হয়ে থাকতে পারে।

শুক্রবার সকালেই তিনবন্ধুর একজন জানালো, ওর ভীষণ শরীর ব্যাথা আর জ্বর। সর্দি তো রয়েছেই। আমি কিন্তু তখনও নিশ্চিত নই। আমার সমস্যা কী! কারণ আমার কোনে সিম্পটমই নেই। কিন্তু জ্বর বাড়তে থাকলো। বেলা ৯টা নাগাদ জ্বর ১০৩ ডিগ্রি হলো। শরীর কাঁপতে থাকলো। প্যারাসিটামলে জ্বর নামছে না। ফলে সাপোজিটর দেয়া লাগলো। জ্বর নেমে গেলো। শুধু জ্বর হওয়ায় বেশি ভয় পেয়ে গেলাম। আমি ডেঙ্গুর ভয় পেলাম। সর্দি ও কাশি ব্যাতীত শুধু জ্বর তো করোনা নয় মোটেই। আমি এভারকেয়ারে গিয়ে করোনা টেস্টের সাথে ডেঙ্গু টেস্টও করিয়ে আসলাম।

রাতের মধ্যে কোভিড নিগেটিভ রিপোর্ট পেলাম। আরটি-পিসিআর। মানে শতভাগ নিশ্চিত। আমি করোনাক্রান্ত নই। বাসায় ছেলের জন্মদিনে ওর বন্ধুসহ সকলে খুশি। কিন্তু যদি ডেঙ্গুও নিগেটিভ আসে! তাহলে জ্বর কেনো! বিনা কারণে তো জ্বর আসবে না!

আমি মোটামুটি সোমবারের ডিনারে ফুড পয়েজনিং নিয়ে নিশ্চিত হলাম। কারণ শনিবার সকাল নাগাদ জানা গেলো, আমি ডেঙ্গু নিগেটিভ। কিন্তু ততোক্ষণে পেটের সমস্যাও কেটে গেছে। তবে, শরীর ভীষণ দুর্বল।

হিউম্যান এইড ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করলাম। ওরা যন্ত্রপাতি পাঠিয়ে বাসায় থেকে সবধরনের ব্লাড স্যাম্পল, চেস্ট এক্স-রে ও ইসিজি করালো। মানে, রোগটা আসলে কী! কারণ, করোনা আর ডেঙ্গু ছাড়া জ্বর তো স্বাভাবিক নয়। যদিও শনিবার সকাল থেকে আর জ্বর আসলো না।

আরও পড়ুন: আর্ট নিউজ পরিবারে করোনার থাবা

রোববার সন্ধ্যা নাগাদ সহধর্মিনী বলতে শুরু করলেন, শরীরটা ভালো লাগছে না! রাতে হালকা জ্বরও আসলো। ফলে একটা প্যারাসিটামল তিনি সেবন করলেন। সোমবার সকালে তার ১০১ ডিগ্রি জ্বর।

সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় বাসায় হিউম্যান এইড ফাউন্ডেশন থেকে অ্যান্টিজেন টেস্ট করানো হলো। বউ পজিটিভ। ছেলে মেয়েরা সকলে নিগেটিভ। ওরা জোর করে আমারও টেস্ট করালো। আমিও পজিটিভ।

আরও পড়ুন: হাসপাতালে পরীমনি

অবশেষে করোনার সাক্ষাত ঘটলো। যদিও আমার কোনোই সিম্পটম নেই। ছিলোও না। তবে, গতকাল থেকে কোনো রকম গন্ধ আর অনুভব করছি না। এমনকি, বিড়ালের খাবার দুর্গন্ধযুক্ত সামুদ্রিক মাছের গন্ধও আর পাচ্ছি না।

লেখক পরিচিতি: এম এ আখের, উপ-সচিব, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়

আরও সংবাদ পড়তে ক্লিক করুন: http://artnewsbd.com

আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে: ARTNews BD

https://www.youtube.com/channel/UCC2oLwZJYHIEygcbPX3OsWQ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *