৯ জুন ২০২২ (নিউজ ডেস্ক): হিরো আলমের রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়া নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে তুলকালাম কাণ্ড। তারা ধুয়ে দিচ্ছেন হিরো আলমকে। সমালোচনায় জর্জরিত করছেন তাকে। তবে দেরিতে হলেও হিরো আলমের পক্ষেও নেমে পড়েছেন অনেক নেটিজেন। তারমানে অবশেষে নেটিজেনদের পাশে পেলেন হিরো আলম। আর হিরো আলমও এবার মুখ খুললেন। সাফাই গাইলেন নিজের স্বপক্ষে।
হিরো আলমের কণ্ঠে ভুল সুর আর ভুল উচ্চারণে ক্ষেপেছেন রবীন্দ্রপ্রেমীরা। অনেকে আবার গান না শুনেই চিলের পিছে ছুটছেন। এমন অবস্থায় তার পক্ষে নেটিজেনদের কেউ কেউ লিখতে শুরু করলেন ফেসবুকে।
আবার কেউ লিখলেন মধ্যপন্থায়। এদেরই একজন লিখলেন, “হিরো আলম গান করেন, অভিনয় করেন তাঁর রুচি, পছন্দ আর যোগ্যতা অনুযায়ী। আর আমরা যারা তাঁর গান শুনি বা অভিনয় দেখি, লাইক-কমেন্ট-শেয়ার দিই সেও আমাদের রুচি, পছন্দ আর যোগ্যতা অনুযায়ী; হোক না তা ফান কন্টেন্ট বা অন্যকিছু। সমালোচনার জন্য আমরা যারা তাঁর কন্টেন্ট শেয়ার দিই, সেটিও কিন্তু তার উৎপাদিত পণ্যের বাজার বিস্তারে সহায়ক হয়। তাই দোষ আসলে কার; যিনি সস্তা প্রোডাক্ট বানালেন নাকি যাঁরা তাঁর প্রোডাক্টকে জনপ্রিয় করতে সহায়তা করলেন? আমরাই একজন হিরো আলমকে নির্মাণ করেছি। এখন আমাদের নির্মিত হিরোর আয়নায় দেখতে হবে দেশের সংস্কৃতি। এতে অবাক হবার কী আছে!”
তবে মোহলী জোলা নামের একজন ৪ জুলাই লিখেলেন বেশ রসিয়ে, যুক্তি দিয়ে। তিনি লিখলেন, “হিরো আলমের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলাম। সে তার মতো করে গানটি গেয়েছে। এবং সে গালি শুনছে সোশ্যাল মিডিয়ার শ্রোতাদের কাছে। কিছু অতিভক্ত রবীন্দ্রনাথ-প্রেমী এমন সব কথা বলছেন যাতে এই গান নিয়ে আলোচনা আরো গতিশীল হচ্ছে। কেউ কেউ বলেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বিকৃত করার দায়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করার কথা। আমি এখানে হিরো আলমের পক্ষপাতী।“
নিজের বক্তব্যের ধার বাড়াতে যুক্তি দিলেন বেশ কিছু। লিখলেন, “হিরো আলম কোনো পেশাদার শিল্পী নয়। সুতরাং সে গানটির সুরের সঠিক প্রয়োগ ঘটাতে পারেনি। তার সাধ্য যতটুকু, ততটুকুই গেয়েছে সে। তার কাছে হেমন্ত মুখার্জীর মতো সুললিত কিছু আশা করা ঠিক নয়। এমন কি ভুল উচ্চারণের দায়ে জর্জরিত তার গানকে হৃদয়গ্রাহী বলার কোনো উপায় নেই। না থাক সেই পেশাদারী সুর, টান-টান উচ্চারণ। তার গানে রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো তো আছে! সেটাই তো যথেষ্ট। রবীন্দ্রনাথ কি শুধু নাগরিক শিক্ষিত জনতার? একটু কম লেখাপড়া করা, মফস্বলের সাধারণ মানুষ তাকে কি চিনবে না? তাদের কাছে না হয় শুধু কথাগুলোই পৌঁছুলো! রাবীন্দ্রিক সুরের চর্চা এবং অন্যান্য নান্দনিকতার বিষয় না হয় মেট্রোপলিটান অ্যাটিচ্যুড হয়েই থাক। কেউ একটু ভিন্ন সুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে সেই গান রামপ্রসাদী বা আলাওলি হয় না। কারণ রবীন্দ্রসঙ্গীতের মূল যাদু তার বাণীতে। সুরে নয়।
প্রসঙ্গক্রমে বলতেই পারি, বিশ্বভারতী এককালে দেবব্রত বিশ্বাসের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো একটু ভিন্নভাবের গায়কীর জন্য। আরেকটি বিষয়, রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইম্প্রোভাইজেশন হচ্ছে অহরহ। এই গানের মাথা, ওই গানের লেজ, ওই গানের পেট…. অনেকরকম রূপান্তর দেখি । ১৯৫০-এর রেকর্ড করা রবীন্দ্রসঙ্গীত আর এখনকার গায়কদের গায়কীতে বিস্তর ফারাক। তবে গানের বাণী বা কথায় কোনো গরমিল নেই। হিরো আলমের গাওয়া গানটিতেও বাণীর কোনো গরমিল নাই। তার উচ্চারণ আঞ্চলিকতাদুষ্ট, সে প্রসঙ্গ ভিন্ন।”
তার পরের যুক্তি, “রবীন্দ্রনাথের গান ঐশীবাণী নয়। তার সুরও ঐশীসুর নয়। অন্য অনেকেই তার গান ভুলভাল করে গায়, কথা ও সুরে। তখন এতোটা প্রতিক্রিয়া হয় না যতটা প্রতিক্রিয়া হিরো আলমের বেলায় দেখা যাচ্ছে! একথা কি তবে স্পষ্ট যে রবীন্দ্রসঙ্গীত একধরণের আভিজাত্য, একধরণের কৌলিন্যের প্রতীক, একটি বিশেষ শ্রেণীর জন্য বিশেষ ব্রান্ডের মতো–যে ব্রান্ড আপামর জনতার নয়। হিরো আলম ও তার মতো গ্রামের মানুষ, মফস্বলের মানুষ কি রবীন্দ্র-ব্রান্ডে অনুপযোগী, অচ্ছুত? রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। তিনি আমার কবি, শেখ হাসিনা-মমতা ব্যানার্জীর কবি, আবার হিরো আলমেরও কবি। সবাই তো গায়ক নয়। কিন্তু সবাই বাংলাভাষী বটে! রবীন্দ্রনাথ শুধু অভিজাত বাঙালীর বিশ্বকবি এমন ভাবনা হাস্যকর!”
এরপর বললেন, “Everybody can cook but everyone is not chef! তেমনি গান সবাই গায়, কিন্তু সবাই গায়ক নয়। হিরো আলম গায়ক নয়। সে হিরো, যদিও বা স্বঘোষিত। তার গান গাওয়া নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। শুনতে ভালো না লাগলে শুনবো না। রান্নার বেলায় যেমন শেফ-এর হাতে খাদ্য শিল্প হয়ে ওঠে, তেমনি প্রকৃত গায়কের কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত সুললিত হয়। তাই বলে যারা শেফ নন, তারা কি কখনো রাঁধবেন না? শেফ নন, নিছক ঠেকায় পড়ে রাঁধুনী হয়েছেন, বা শখ করে রাঁধুনি হন, এমন মানুষের রান্না কতো খেয়েছি! গায়ক নন কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছেন, এমন কতো শুনেছি! শেফ ছাড়া কারো হাতে রান্না খাই না, এবং প্রকৃত পেশাদার গায়ক ছাড়া গান শুনি না, এমন দিব্বি করিনি এখনো। এমনটা শুধু অভিজাতরাই করে থাকেন। আমি অভিজাত নই; আমজনতার একজন। হিরো আলম রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে আমার রবীন্দ্রনাথ তাই কোনোভাবেই খাটো হয়ে যান না।”
এই বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি যেন হিরো আলমের কণ্ঠে। সমালোচিত হওয়ার পর আবার সামনে এলেন। বললেন, “আমি সঙ্গীত শিল্পী নই। গান গেয়েছি ভালোবেসে। শখ মেটাতে গেয়েছি। কারও কোন ক্ষতিতো করিনি।”
হিরো আলম/এএমএম/আরএম
আরও খবর পড়তে: artnewsbd.com
আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে: ARTNews BD
















Leave a Reply