শঙ্কিত জনপদ: নারীর ভয়, প্রতিরোধ ও মর্যাদার গল্প

ফিচার | কাজী তামান্না তৃষা

একটি চিত্রকর্ম কখনও শুধু রং, রেখা কিংবা অবয়বের সমষ্টি নয়; কখনও তা হয়ে ওঠে সময়ের সাক্ষী, মানুষের অনুভূতির ভাষা। শঙ্কিত জনপদ (The Scared Town) তেমনই একটি শিল্পকর্ম।

সদ্য বিদায়ী বছরের শেষ সপ্তাহে আমার শিল্পীজীবনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ছিল একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী ‘পঁচিশে পঁচিশ। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর শুরু হওয়া প্রদর্শনীতে বিভিন্ন মাধ্যমের ২৫টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছিল। প্রদর্শনীর সময় সাংবাদিক রহমান মুস্তাফিজ আমার একটি সাক্ষাৎকার নেন, যা আর্ট নিউজে প্রকাশিত হয়। সাক্ষাতকারের বড় একটি অংশজুড়ে ছিল শঙ্কিত জনপদ সম্পর্কে  কথোপকথন। সাক্ষাৎকার দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাকে আমার নিজের শিল্পভাবনা নতুন করে ভাবিয়েছে।

শঙ্কিত জনপদ; শিল্পী: তাজী তামান্না; মিশ্র মাধ্যম

কিছু শিল্পকর্ম তৈরি করার পর সেগুলোকে আর শুধু নিজের মনে হয় না। মানুষের সামনে তুলে ধরার পর দর্শকের চোখ, প্রশ্ন ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে কাজটি যেন নতুন একটি জীবন পায়। ‘শঙ্কিত জনপদ’ তেমনই একটি শিল্পকর্ম।

১৬ বাই ২২ ইঞ্চি মাপের কাজটি তৈরির সময় আমার সামনে ছিল তিনজন নারীর অবয়ব। পাটের তৈরি চট দিয়ে তাদের শরীরের কাঠামো তৈরি করেছি। তার ওপর ব্যবহার করেছি অ্যাক্রেলিক রং। ছবির সামনে থাকা কালো থাবাগুলো তৈরি করেছি সুতি কাপড় দিয়ে। অ্যাক্রেলিক রঙের ব্যবহারে থাবাগুলোতে ত্রিমাত্রিক অনুভূতি আনার চেষ্টা করেছি। নখ থেকে রক্ত ঝরে পড়ার দৃশ্যটি ফুটিয়ে তুলেছি লাল রঙে। শিল্পকর্মে তিনজন নারীর অবয়বের মধ্য দিয়ে আমি তুলে ধরতে চেয়েছি ভয়, অনিরাপত্তা, সামাজিক চাপ এবং সেই ভয়কে অতিক্রম করে নারীর দাঁড়িয়ে থাকার গল্প।

কিন্তু সাক্ষাৎকারের সময় বুঝলাম, উপকরণের এই বিবরণ আসলে ছবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল- কেন এমন একটি ছবি এঁকেছি?

সাক্ষাতকারে আমার কাজটি নিয়ে জানতে চাইলে, নিজের ভেতরের কথাগুলো ভাষায় প্রকাশ করার প্রয়োজন অনুভব করলাম। আমি তখন বলেছিলাম, ‘শঙ্কিত জনপদ’ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ঘটনার গল্প নয়। এটি এমন একটি সামাজিক বাস্তবতার প্রতীক, যেখানে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নিজের কথা বলার অধিকার নিয়ে মানুষের উদ্বেগ রয়েছে।

তিনটি নারীর অবয়বের দিকে তাকালে আমার মনে হয়, তারা একই গল্প বলছে না। প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আলাদা হতে পারে। তাদের ভয়, পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থানও এক নয়। কিন্তু নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার এবং সম্মানের সঙ্গে নিজের জীবন পরিচালনার আকাঙ্ক্ষা তাদের এক জায়গায় নিয়ে আসে।

কালো থাবাগুলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বোঝানোর জন্য করিনি। আমার কাছে এগুলো ভয়, নিপীড়ন, ক্ষমতার অসমতা এবং মানুষের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে দেওয়া নানা অদৃশ্য শক্তির প্রতীক। রক্তাক্ত নখ সেই আঘাতের দৃশ্যমান চিহ্ন।

তবে আমি চাইনি ছবিটি শুধু ভয় তৈরি করুক। বরং দর্শক ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করুক- একটি সমাজে কেন মানুষকে শঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়? কেন কারও নিরাপত্তা বা মর্যাদা অন্য কারও ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে? আর আমরা কীভাবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ সমাজ তৈরি করতে পারি?

সাক্ষাতকারের অভিজ্ঞতা আমাকে আরেকটি বিষয়ও উপলব্ধি করিয়েছে। নারীকে নিয়ে কোনো গল্প বলার সময় তাকে শুধু অসহায় বা ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করা যথেষ্ট নয়। তার নিজস্ব কণ্ঠ, অভিজ্ঞতা, সক্ষমতা ও মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। শিল্পের ক্ষেত্রেও একই দায়িত্ব রয়েছে।

সেদিন সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার পর আমার মনে হয়েছিল, সাক্ষাতকার গ্রহণকারী আসলে শুধু আমার ছবির গল্প জানতে চাননি; তাঁর প্রশ্নগুলো আমাকে আমার নিজের বক্তব্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। ‘শঙ্কিত জনপদ’ তাই আমার কাছে এখন শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়। এটি একটি প্রশ্ন—যে জনপদে মানুষ বাস করে, সেখানে ভয় কি স্বাভাবিক হয়ে যাবে, নাকি সম্মান, নিরাপত্তা, সমতা ও ন্যায়বিচারই হবে মানুষের অধিকার?

আমি বিশ্বাস করি, শিল্প সবসময় উত্তর দেয় না। কখনও কখনও একটি ভালো শিল্পকর্মের সবচেয়ে বড় কাজ হলো— একটি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন মানুষের মনে রেখে যাওয়া।

ফিচার/এএমটি/এমএম