নেশা

শারমিন আফরোজ বন্যা

শারমিন আফরোজ বন্যা: শান্তকে যে এতো সহজে ওরা ম্যানেজ করতে পারবে হাসি আশা করেনি একটুও। গত এক সপ্তাহ নিজের প্রাণটাকে হাতে নিয়ে পার করেছে সে। বুকের মানিক। বাইশটা বছরের প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহুর্ত মনের গহীনে হানা দিচ্ছে এখন। ওরা বেরিয়ে যেতেই সে নিজের ঘর থেকে দৌঁড়ে বেরিয়ে এসে প্রথমে মেইন দরজার লকটা লাগিয়ে একছুটে বারান্দায় চলে এসেছিল। তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজেদের বিল্ডিংয়ের গেইটটা দেখা যায়। গেইট থেকে বের হওয়া গাড়িগুলো পথের দিকে ঘুরলে গাড়ির মুখটা তার বারান্দামুখী হয়। তাই সে দৌঁড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু খুব একটা লাভ হয়নি তাতে। বড় মাইক্রো বাসটার পিছনের গ্লাস অস্বচ্ছ। শুধু ড্রাইভার আর তার পাশের সিটে বসা লোকটাকে দেখতে পেল সে ওপর থেকে। লোকটা মোবাইলে কাউকে ডায়াল করছে সেটুকুও বোঝা যায় তিনতলার বারান্দা থেকে। এর বেশি কিছু না। গাড়িটা চলে যেতেই ভিতরের আটকে রাখা কান্নাটা তাকে ঠেলে ঘরের ভিতর নিয়ে আসে।

শুণ্য, ফাঁকা দেড় হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্লাটটা যেন তাকে গিলে খেতে চায়। তারপরও সে কেন কান্নার জন্য বাথরুমে ঢোকে, নিজেও বোঝে না। বাথরুমের দরজায় পিঠটা রেখে সে ফ্লোরে বসে পরে। তার বুকভাঙা কান্না যেন কেউ না শুনতে পায়। তার দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি নামে… বুক ভেঙে চিৎকার বেরিয়ে আসে। ও আল্লাহ, ও আল্লাহ এই দিন দেখার জন্যই কি এতো মায়া, এতো যত্ন দিয়ে ওকে বড় করে তুললাম। এতো কান্না সে আর কোনদিনও কাঁদেনি।

যেদিন তার স্বামী মারা গেল, হঠাৎ… এই একটু বুকে ব্যথা বুকে ব্যাথা বলতে বলতেই চলে গেল। কাঁদবার ফুরসত তার ছিল না। ভাইবোন, আত্মীয় বন্ধু দিয়ে বাড়ি ভরে গিয়েছিল। শান্ত আর শান্তর চেয়ে দু’বছরের বড় আরেকটা ছেলে। দশ আর বারো! বাবার অসম্ভব ন্যাওটা। বাবার লাশের পাশে ঘুরে ঘুরে এসে যখন মার কাছে আসছিল, হাসি দ্রুত নিজের চোখের জল মুছে নিয়েছিল। জানে, সবাই আছে। দেখবে। তবু তার ভিতর বলেছিল ভেঙে পরলে ওদের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে! হায়! কতোবড় ক্ষতির সামনে আজ সে দাঁড়িয়ে।

বড়টা বরাবরই চটপটে, আর ছোটটা হয়েছিল ভীষণ শান্ত। সেইজন্যই ওর বাবা নাম রেখেছিল শান্ত। ছোটবেলায় কাঁদতো না খুব একটা। বড় ভাইয়ের চামচা হয়ে ঘুরে বেড়াত। কেড়ে নেওয়া দূরে থাক নিজের অংশটুকুর জন্যও লোভ করত না। পেলে ভালো, না পেলেও ঠিক আছে! ডাক্তার বারবার জানতে চাইছিলেন, ‘ও কি জীবনটা অন্য রকম চেয়েছিল? আপনারা কি জোর করে ওর ওপর কিছু চাপিয়ে দিয়েছিলেন? কোন শখ কেড়ে নিয়েছিলেন কি? বা কোন মেয়ে আছে জীবনে?’

ডাক্তারকে সে কি করে বোঝায়, ওর তো কোন চাহিদাই ছিল না। পড়ব না বলে জিদ করত না। খুব বেশি বন্ধু বান্ধব নিয়ে হুল্লোড় করতে ভালবাসতো না। মায়ের সাথে, ভাইয়ের সাথে চমৎকার বন্ধুত্ব। জীবনে কোন মেয়ে এসে থাকলে সবচে প্রথম তাদের দু’জনকেই বলার কথা। বরং ওর দু একজন বান্ধবীর ব্যবহার দেখে কতোবার জানতে চেয়েছি, ‘ওদের কাউকে তোর ভালো লাগে না? একটু বেশি কার কথা ভাবিস বলতো আমাকে?’ কি যে সুন্দর শান্তর মুখ টিপে দেয়া হাসিটা। নিজের যেন চোখ লেগে না যায়, তাই মনে মনে বলত ‘মা শা আল্লাহ! নজর যেন না লাগে!’

সেই ছেলেটাকে আজ লোক দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। গত সাতদিন কঠিন লাল চোখ নিয়ে শান্ত ঘরময় পায়চারি করেছে। মাঝে মাঝেই মায়ের ঘরে এসে বিছানায় বসে। যেন মাকে পাহারা দেয়। মায়ের ফোনটা বেজে উঠলে দরজায় ওর ছায়াটা দেখতে পেয়েছে হাসি। নিজের কাছে মিথ্যা বলা যায় না, সে ভয় পেত, ভীষণ ভয় পাচ্ছিল। ছেলের এই চেহারা সে চেনে না।

বড়ছেলেটা কুয়েটে চান্স পাওয়ার পর বাড়িটা খালি হয়ে গিয়েছিল। শান্ত নিজের করে একলা একটা রুম পেয়ে গেল। মাত্র কলেজে ভর্তি হওয়া নতুন নতুন কিছু বন্ধু! তারা বাড়িতেও আসতে লাগল। এলে ঘরে গান বাজে, বিছানায় ফ্লোরে ছড়ানো বই খাতা। খুব পড়াশোনা, আনন্দ, খাওয়া দাওয়া।

হাসি ছেলে দু’টোকে নিজের মতো ছেড়ে দিয়ে বড় করেনি। ছোটবেলা থেকেই সে ওদের বন্ধুর মতো সাথে সাথে থেকেছে। ওদের খুব কাছের বন্ধুদের মায়েদের সাথে মিশেছে। মাঝে মাঝে মায়েদেরসহ গেট টুগেদার। কিন্তু তা সত্ত্বেও আস্তে আস্তে দুই ভাইয়ের মধ্যে হৃদ্যতা বেড়ে গেল আর তার সাথে দূরত্ব।

মিউজিক, মুভি, গেইমস নিয়ে যখন ওরা কথা বলে, হাসির সাথে একটা জেনারেশন গ্যাপ হয়েই যায়, অবধারিত ভাবে। মা বাবার যুগের সাথে সন্তানের যুগের এখন ২৫/৩০ বছরের ফারাক। রুচিতে এক থাকা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। শান্ত আর তার ভাই খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল। খুব পড়াশোনা নিয়ে মেতে না থাকলেও একেবারেই বোকা ছিল না দু’জনে কেউই। ওদের কাছে হাসি কোনদিন ক্লাসের পজিশন চায়নি। বলতো, ‘ফেল করা যাবে না, নিতে পারব না!’ ফেল না করার জন্য ওরা মন দিয়ে ক্লাস করত, বাড়ির কাজ করত, পরীক্ষার সময় একটু বেশি পড়ত। বছর শেষে দু’জনেই রেজাল্ট হাতে পাওয়া মায়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতো। হাসির বুক ভরে যেত। পরিচ্ছন্ন রিপোর্ট কার্ড, পরিচ্ছন্ন শ্রেণি শিক্ষকের মন্তব্য।

হাসির স্বামী ওদের মাথাগোঁজার মানসম্মত ঠাঁইটুকু করে রেখে গেছেন। তাই স্কুলের চাকরি, আর দুয়েকটা টিউশনি দিয়ে চলতে কস্ট হলেও, কারো মুখাপেক্ষী কখনো হতে হয়নি তাদের। হাসি বাচ্চাদের প্রয়োজন আর প্রত্যাশার মাঝে পার্থক্য বোঝাতে চেষ্টা করেছে। তাই সুন্দর করে বাঁচাটা খুব কঠিন হয়ে ওঠেনি তাদের। শুধু ছিমছাম জীবনে একটা মানুষ ছবি হয়ে গিয়েছিল। বাচ্চাদুটো বাবা ছাড়া জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেল। কেবল ভীষণ জ্যোৎস্না মাখা রাতগুলো, ঝুম বৃষ্টির দিনগুলো, অনেক কাজের চাপের সময়গুলো, বড়টার ভর্তি পরীক্ষার দিনগুলোর প্রতিটা মুহূর্ত বুকের ভেতরটা খামচে থাকতো তার। একা একা নিজে নিজে কথা বলার রোগ হয়ে গেল। রিকশায় পাশাপাশি বসে শান্ত কতোদিন হাসতে হাসতে বলেছে, ‘মা, কার সাথে কথা বলো?’

সেই ছেলেটা হঠাৎ কেমন একটু একটু পাল্টে যেতে লাগল। কলেজে উঠে শান্ত একটা টিউশনি পেয়েছিল। ক্লাস থ্রি’র বাচ্চা। মাস শেষে সাত হাজার টাকা। প্রথম প্রথম পুরোটাই মাকে দিয়ে দিত। একমাসে দুহাজার টাকা দিল না। মাকে বললো, ‘এখন কলেজে যাই, বন্ধু বান্ধবরা খাওয়ায়, আমারও দুয়েকদিন খাওয়ানো দরকার।’ কথাটা বলেছিল মাথাটা নিচু করে। হাসির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। তারপর থেকে চোখ রাখা শুরু। কিন্তু কোথাও কিছু অনিয়ম চোখে পরল না, ঘরে যখন না থাকে, সারা ঘর ওলট পালট করে খুঁজল। কোথাও কি কিছু লুকিয়ে রাখল? কোথাও কিচ্ছু পায়নি সে। আজ পর্যন্তও না। শুধু ছেলেটা বদলে যেতে থাকল।

প্রথম প্রথম রাতে দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে ঘুমাতে শুরু করল। রোজ রাতে কতোবার যে সে ছেলেদের রুমে যায়। ঘুম ভাঙলেই দেখতে যায় ঘামলো কিনা, বেশি জোরে ঘুরছে কি ফ্যানটা? লেপটা কি পরে গেল গা থেকে? ফজরের নামাজের জন্য তুলে দেয়া। একদিন দরজাটা বন্ধ পেল। আতঙ্কে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এসেছিল। প্রথমে আস্তে আস্তে দরজায় টোকা, তারপর ধুমধুম পেটানো।

শান্ত উঠে এসেছিল উদ্ভ্রান্তের মতো। চোখ মেলতে পারছে না, কফ জড়ানো ভারি গলায় যখন তার চোখে চোখ রেখে বলেছিল, ‘কি হয়েছে!’ তার শিরদাঁড়া বেয়ে এক অজানা ভয়ের স্রোত নেমে এসেছিল। ছেলের টেনে খুলে রাখা লাল চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে সে শুধু ভেবেছিল ‘এখন আমার কি হবে? আমার এই সোনার টুকরা ছেলে! যা ভাবছি তাই কি তবে সত্যি! যদি তাই হয়, ওকে কি করে ফেরাবো? কিভাবে সাহায্য করবো ওকে? এতো একটা মরণফাঁদ।’ তখনও বোঝেনি এই ফাঁদ শুধু একজনকে পেঁচিয়ে ধরে না, ধরে পুরো পরিবারটাকে।

বড় ছেলেকে ফোন দিয়েছিল পরদিনই। কিন্তু বলতে পারেনি। সত্যিটা এখনো সে জানে না। ওর একটা কি পরীক্ষা চলছে। শেষ হলে আগামী সপ্তাহে দু’দিনের জন্য আসবে। বুকের কাঁপনটা তাই সে গোপন করল। আসুক। আসলে কথা বলবো। এই ছেলেটাও তো খুব বড় নয়। কতোটা কষ্ট নিতে পারবে সে!

বাড়ি ফিরেই ভাই শান্তর দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠেছিল। ‘একি অবস্থা তোর!’ এ ক’দিনেই শান্তর কন্ঠার হার বেরিয়ে গেছে। সারারাত জেগে থেকে, দিনে সারাদিন ঘুমায়। ক্লাস মিস হচ্ছে প্রায়ই। খাওয়া কমে গেছে ভীষণভাবে। আবার মাঝে মাঝে গোগ্রাসে খায়। মা আর বড় ভাই নিজেদের খাওয়া বন্ধ রেখে শান্তর খাওয়া দেখে। চাহনির চুম্বক শান্ত হঠাৎ টের পায়। মুখ তুলতেই চোখাচোখি। তারপর দুই ভাই বসে, দরজা বন্ধ করে। সেবার বড়ভাই সাত দিন বেশি থেকে যায়। দুই ভাই রিকশা চেপে একটা রিহ্যাব সেন্টারে যায়। সাত দিনের কোর্সে নিজেই ভর্তি হতে রাজি হয় শান্ত। সাতদিন পর ভাই তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনে যখন, হাসি দরজায় দাঁড়িয়ে ভাবে আজ তাদের ঈদ। কি সুন্দর লাগছে একসাথে হেটে আসা রাজপুত্র দু’জনকে। মা মনে মনে বলে, ‘মা শা আল্লাহ! নজর যেন না লাগে!’

বাথরুমের ফ্লোরে বসে এইসব ভাবতে ভাবতে তার বড়টার কথা মনে পরে। ওতো কি হলো জানার জন্যে অপেক্ষা করে আছে। ফাইনাল সেমিস্টার চলছে তার। পড়াশোনায় মন দেওয়া কঠিন হয়ে পরে আজকাল ছেলেটার। অসময়ে মা যদি কখনও ফোন দেয়, ভেতরটা কেঁপে ওঠে অজানা আশঙ্কায়। টাকার জন্যে কি আজও ঘরে কিছু ভাঙচুর করল? মাকে আঘাত করলো নাতো! আবার কি পুলিশের হাতে ধরা পরে গেল ড্রাগসসহ? একবার ধরা পরে কতোগুলো টাকা বেরিয়ে গেল! তার আর মায়ের কতো কষ্টের আয়! কতো শখ বাদ দিতে হয় আজকাল টাকার জন্যে। সেদিন শুনেছে, বাড়ির গার্ডকে কোন কারণ ছাড়াই পিটিয়েছে। প্রতিদিন রাতে সে মাকে একটা ফোন দেয়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এসব প্রশ্ন করে করে জেনে নেয়। হাসি আজকাল সব কথা বড় কে জানায় না। ঘরে টাকা রাখা যায় না! ছোট ছোট মূল্যবান জিনিস চুরি যায় ঘর থেকে! নিজের ঘরে হাসি চোরের মত থাকে। রোজকার দিনটা কাটে এক আতঙ্ক নিয়ে, কখন টাকাটা চাইবে? আজ কতো চাইবে?

সেন্টার থেকে ফিরে এসে অনেকগুলো দিন বেশ কাটছিলো। টিউশনিতে আর যেতে দেয়নি শান্তকে। কলেজের ক্লাস শেষে সোজা বাড়ি চলে আসত। মা আর ছেলের একসাথের আনন্দময় কয়েকটা দিন। এরমধ্যে বড় ছেলের ছুটি হলে তিনজন। একটু ভালোমন্দ রান্না, মাঝে মাঝে একটু বাইরে খাওয়া, কাজিনদের কাছে ছুটে যাওয়া বা তাদের ডাকা। গান, আড্ডা, হাসি… হাসির মনে হয় ওই দিনগুলো সত্য নয়, এমন কোন দিন তার জীবনে কখনও ছিল না!

ক’দিন ধরেই হাসির সন্দেহ হচ্ছিল, তাই বড়কে বলা। তার জের হিসেবে একদিন বড়র সাথে তুমুল লাগিয়ে নিল শান্ত। ‘বেশি শাসন করতে আসবি না! হ্যাঁ, মিশব আমি ওদের সাথে!… ‘! সেই আগুন চোখ! বড় ছেলের ব্যবহারে হাসির শুধু মনে হয়েছিল এখন ওই তার সাহস, ভরসার জায়গা। বড় কিন্তু ঘাবড়ালো না একটুও। বন্ধুর হাসি মুখে লেগে আছে।

কথায়, গল্পে জানা গেল আবারও ড্রাগস নিতে শুরু করেছে শান্ত। এবার বন্ধুরা ডেকে নিয়ে জোর করে খাইয়ে দিয়েছে প্রথমে। দু’একবার সে টাকা দেয়, আর বেশি দিন বন্ধুরাই শেয়ার করে। হাসির পায়ের নীচের মাটি সরে গিয়েছিল। কানদুটো আগুন গরম। সে বসে পরেছিল মাটিতে। হাসির অবস্থা দেখে শান্ত কথা দিল, রিহ্যাব নয়, সে নিজে নিজে ছেড়ে দেবে, চিকিৎসা পদ্ধতিতো তার জানাই। সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও তার বিপি বেড়ে যায়।

মেয়েমানুষের জান এতো শক্ত, নিজেরটা দিয়ে সে বোঝে এখন। তার মনে হয়, এতোকিছু দেখেও তার মৃত্যু হয়নি, সে বেঁচে আছে কি দেখবার জন্যে? শান্ত নিজেই এটাচ বাথওয়ালা একটা রুম খালি করে নিল। সাতদিন ঘর থেকে বের হয়নি। প্রথমদিন শান্তর অমন সুন্দর শরীরটা যেন ভেঙেচুরে গেল খিচুনিতে। বন্ধ দরজার ভেতর থেকে পশুর মতো শব্দ বেড়িয়ে আসত। কি কষ্ট। জ্বালা কমানোর জন্য বার বার গোসল। তারপর শুরু হলো লুজ মোশন। তিনদিন পর সে ঘর থেকে বের হলো। যেন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বেরিয়ে এসেছে সে। পুরো মাসটাই নিজেকে সে ঘরে বন্দি রেখেছিল।

হাসি ক’দিন খুব যত্ন নিয়েছিল ছেলের। আশা জেগেছিল মনে, যে ছেলের নেশা করার কোন নির্দিষ্ট কারণ নাই, কোন হতাশা, না পাওয়া ইত্যাদি বিষয় নাই, সে নিশ্চয়ই আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে! কিন্তু এ এক মরণ নেশা। সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর, ভাই আর মাকে শান্তই বলেছিল, নেশার প্রবাহ একবার রক্তে মিশে গেলে, তার আর নতুন করে কোন কারণের দরকার হয় না। তখন অবসর বসে থাকলেই নেশা তাকে টানে। সেই টানের কাছে শান্ত আবার ধরা দিল শিগগিরই। এবার নিজেই। শান্ত এবার আর বড়ভাই বাড়ি এলে তাকে পাত্তা দেয় না। মায়ের দিকে চোখ লাল করে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে, ‘৩০০ টাকা লাগবে!’ হাসির বুকের ভেতরটা একটা কাকড়ার নখ যেন নিমিষে খামচি দিয়ে ধরে। সে এখন আগেই টাকা ভাঙিয়ে রাখে। কারণ ৫০০ টাকার নোট দিলে বাকিটা ফেরে না। সবচেয়ে খারাপ লাগে, টাকাটা যখন লাগবে তখন শান্ত একটা ভিন্ন চেহারা নিয়ে এসে দাঁড়ায়! সে চাহনী হাসিকে যেমন ভীত কর তোলে, একই সাথে কষ্ট! শান্তর নষ্ট বা শেষ হয়ে যাওয়া তাকেও ধ্বংস করে তিলে তিলে। বোঝানো যায় না এখন, তার আগেই শান্ত থামিয়ে দেয়। শান্তশিষ্ট ছেলেটার গলায় এখন অসুরের জোর।

এতো অশান্তিতে থেকেও সমাজকে হাসির জানাতে ইচ্ছা করে না কিছু। যদি ফিরে আসে, যদি আবার সম্মানের জীবনে ফিরে আসে, ভালোবাসার জীবনে। সেই আশায় হাসি কারও সাথে এসব কথা শেয়ার করে না। সেটা যে আরো কতো কষ্ট। মনের মধ্যে জ্বলতে থাকা আগুন চেপে রেখে, আত্মীয়তা বন্ধুত্ব চালানো কতো কষ্টের যে ভোগেনি, তাকে কি বোঝানো যায়!

আজকাল হাসি যখন কারও সাথে গল্প করে, বা দুপুরের খাবারটা নিয়ে বসে, শান্ত দরজায় এসে দাঁড়ায়। ইশারায় মাকে ডাকে অথবা ৩টা আঙ্গুল দেখায়, যার মানে ৩০০ টাকা লাগবে। কখনও কখনও সংখ্যাটা বাড়িয়ে দেয়। জানে মা লোকের সামনে সত্য লুকাতে চায়, সে সুযোগটা কাজে লাগায়।

শান্তর সাথে থাকা সেন্টারের অনেক ছেলেদের সাথে তার কথা হয়। সে অভিজ্ঞতা থেকে হাসি আজ এটুকু অন্তত বোঝে নেশার দ্রব্যের সহজলভ্যতাই বেশিরভাগ অবুঝ বাচ্চাগুলোকে নেশাসক্ত করে দিচ্ছে। অনেক ছেলেমেয়েকে সে দেখেছে, যাদের ড্রাগস শুরু করবার সময়টা নিছক কৌতূহল বা সঙ্গ। তারপর ফাঁদে আটকে যায়, আর ফিরতে পারে না। কত রকম ব্যক্তিত্ব তাদের, চৌকস অথবা বুদ্ধিহীন! কিন্তু দিনশেষে পরিণতি এক। তাদের নিজের জীবনের বা বেঁচে থাকার আর কোন মানে থাকে না, বেঁচে থাকা সেই এক চিন্তা নিয়ে! আগামীকাল নেশার টাকাটা কিভাবে ম্যানেজ হবে…! তাকে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কষ্ট সীমাহীন। বুকের ভেতর তুষের আগুন জ্বলে ঘুসঘুস! প্রতিদিনকার বেঁচে থাকাটা যেন একটা আতঙ্ক ও হতাশার মিশ্রণ..! হাসির মনে হয়, ড্রাগস নিয়ে যারা কাজ করে, তাদের একমাত্র সাজা হওয়া উচিৎ মৃত্যুদণ্ড! এ পৃথিবীতে এখন যত পাপ, যত পারিবারিক বা সামাজিক নিষ্ঠুরতা তার মূলে নেশা। নেশাসক্ত মানুষ বোধহীন নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। সিদ্ধান্ত নিতে পারে বিবেকহীন হয়ে। কি করছে, কি তার কনসিকোয়েন্স, তা বোঝার ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যায়!

ইদানিং হাসিকে এর তার থেকে ৫০০ বা হাজার টাকা ধার চাইতে হয়। ছেলেকে নেশার টাকা যোগান দিতে মাসের ইনকাম বাড়াতে হয়েছে। তারপরও প্রায়ই ধার করতে হয়। অপমানে, কষ্টে তার প্রায়ই মরে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সে মরে গেলে শান্তর কি হবে? বড়টা বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, ফাইনাল হয়ে গেলেই বাড়ি ফিরবে, চাকরি হবে, বিয়ে করাতে হবে। আর শান্তটা তারই পাশাপাশি শেষ হয়ে যাচ্ছে…।

হাসি তাই অনেক চেষ্টা করেছে শান্তকে বোঝাতে। কোন লাভ হলো না এবার। এ নিয়ে কবার হলো? তিনবার কি? হ্যাঁ। আগের দুবার নিজেই গিয়েছিল। এবার কিছুতেই বোঝানো গেল না। কিন্তু ইদানিং কেমন পাগলামি করছিল। হ্যালুসিনেশন। আশেপাশে মানুষ দেখতে পায়। শান্ত তখন তাকে মারতে চায়। অ্যারোগেন্ড হয়ে উঠছিল দিন দিন। যেকোন সময় একটা কিছু অঘটনের ভয় পাচ্ছিল সে। শান্ত ইদানিং তাকে পাহারা দেয়। বুঝেছে মা হয়ত তাকে না জানিয়ে রিহ্যাবে ব্যবস্থা করবে! তাই বাধ্য হয়ে এক বন্ধুকে দিয়ে সবটা ব্যবস্থা করেছে সে। খুব ভয় পাচ্ছিল। জোর করলে ও ঠিক কি কি করতে পারে ভেবে ভীষণ আতঙ্ক নিয়ে সে অপেক্ষা করেছে একটা পুরো দিন।

ওরা আসতে এতো দেরি করছিল। শেষ পর্যন্ত ছেলে কোন ঝামেলাই করেনি। ঘর ভর্তি ছ’সাতজন লোক দেখে চুপ মেরে গিয়েছিল। যেতে যেতে বলছিল, ‘মাকে একটু বলে আসি।’ লোকজন ঘরে ঢুকতেই হাসি তার নিজের রুমে দরজা এটে বসেছিল। সে শুনতে পেয়েছিল, লোকজন বলছে, ‘ভেব না, মা তো আসবেন দেখা করতে।’

সেন্টারে যেতে হবে। ফরমালিটিজ সারার ব্যাপারটা তো রয়েছেই। কিন্ত মুলতঃ নিজের অস্থিরতা কমাতেই যেতে হবে। ছেলেটা তার কাছে বলে যেতে চেয়েছিল! হাসি উঠে দাঁড়ায়। নিজেকে পরিষ্কার করে নিয়ে সে বেরিয়ে আসে বাথরুম থেকে। পঞ্চাশের দারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজেকে আজ তার একটা ধ্বংসাবশেষ মনে হয়। অথচ আয়ু থাকলে আরও হয়ত অনেক বছর বেঁচে থাকতে হবে। মৃতের মতোই।

খুব কম সংখ্যক মানুষই পারে নেশার এই চক্র ভাঙতে। হাসি ভাবে, সে কি পারবে শান্তকে এ থেকে বের করে আনতে?

(পুরো গল্পটাই কাল্পনিক। হয়ত অনেকেই নিজের কাছের জনকে খুঁজে পাবেন এখানে। যদিও চেনা কারও একক চরিত্র এখানে নাই!)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *