সব গল্পের নাম হয় না

সৈয়দা জোহরা পারভীন কনা

সৈয়দা জোহরা পারভীন কনার অণুগল্প: বিয়ের প্রথম রাতেই; সহজ বাক্যে বলেছিলো মেয়েটি, বউ বলেই স্বামীত্ব দেখাতে আসবেন না, সুযোগসন্ধানী পুরুষ আমি দুচোখে দেখতে পারি না। প্রতি উত্তরে ছেলেটা বলেছিলো;সব পুরুষ সুযোগ সন্ধানী হয়না বানী, শরীরের টানে না হোক হৃদয়ের টানে একদিন তুমি ঠিক আসবে৷ ততদিন আমাদের মাঝে দূর্রত্বই থাকুক৷

ছেলেটির এমন উত্তর শোনার জন্য মেয়েটি মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। হয়তো মেয়েটি ভেবেছিলো ছেলেটি তাকে জোর করবে। মুখ ফিরে শুয়ে পড়ে মেয়েটি। ছেলেটি বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে এক মনে ভেবেই যায়, হয়তো এবারেও সে ভালোবাসতে পারবে না।

এভাবেই চলে যায় দিন। ছেলেটি রোজ অফিস থেকে ফেরার সময় বেলী ফুলের মালা আনে। মাঝে মাঝে নীল চুড়ি। রংবেরঙের টিপের পাতা। কখনো সে শূন্য হাতে বাড়ি ফেরে না। কেবল যা পারে না তা হলো মেয়েটির হাতে চুড়ি পরিয়ে দেয়া হয় না, কপালে পরানো হয় না টিপ, মাথায় জড়ানো হয় না বেলী ফুলের মালা। আলমারির দক্ষিণে ড্রয়ারে যে একটা নীল শাড়ী রাখা আছে সেটাও হয়তো কখনো চোখে পড়েনি মেয়েটার।

বিয়ের এতমাসেও মেয়েটির সাথে ছেলেটির কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি। তাদের দূরত্বটা তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো। ঘরের বাইরে তারা একে অন্যের খোঁজ রাখতো, কেয়ার করতো। কিন্তু ঘরে এলেই যেন দুটো আগন্তুক অকারণেই একই ছাদেঁর নিচে থেকে যায় মাসের পর মাস। ছেলেটি কখনো অভিযোগ করেনি। তাই হয়তো মেয়েটিরও সুযোগ হয়নি অভিযোগ পূরণের৷

কোন এক ছুটির বিকেলে ছেলেটি আনমনে ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশে সুতো ছিড়ে যাওয়া ভোকাট্টা ঘুড়ি দেখছিলো। পিছন থেকে ডাক পড়লো, শুনছেন? পিছন ফিরে তাকাতেই আয়ানের চোখ কেমন ছানাবড়া হয়ে গেলো। এক পলক তাকাতেই চোখ কেমন নামিয়ে ফেললো। বুকের বাম প্রকোষ্টে অনেক বছর পরে কেমন ঢিবঢিব অনুভতি হাতুড়ি পেটাতে লাগলো। মনে হয় ধুধু মরুভূমিতে প্রচন্ড বৃষ্টির দেখা পাওয়া গেলো বলে৷

সামনে দাঁড়িয়ে থেকে বানী শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে মুখ মলিন করে বললো, বিছানায় না রেখে ফুলগুলোতো হাতেও দেয়া যায়, নাকি?

: সেটা যদি স্বামীত্ব দেখানোর অন্তর্ভুক্ত হয় তাই আর কী…

– হয়েছে যতসব ন্যাকামো। নিন মালা টা খোঁপায় পরিয়ে দিন তো।

বানী ফুলগুলো এগিয়ে দেয় আয়ানের দিকে৷ আলতো হাত ফুল খোঁপায় জড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আয়ান।

– উফ্, টিপ আর চুড়িগুলো কে পরাবে?

ছেলেটি মুচকি হেসে হাতে চুড়ি আর কঁপালে টিপ পরিয়ে জিগ্গাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, : এবার কী শাড়ীটাও পরিয়ে দিতে হবে? ও নাহ্, শাড়ীতো পরেছেন। ওহ্ কুচি ঠিক নেই। আমি নাহয় কুচিই ঠিক করে দেই।

আয়ান হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। মেয়েটি কেবল মুগ্ধতা নিয়ে আকাশের পানে দেখলো। কি সুন্দর সূর্য ডুবছে। গোধুলির অন্তিম এ লগ্ন মনে কেমন বসন্তের বাতাসের দোলা দিলো৷ ছেলেটি উঠে দাঁড়াতেই মেয়েটি জড়িয়ে ধরলো আচমকা। আয়ান টাল সামলাতে না পেরে দেয়ালে পিঠ লেগে গেলো। মেয়েটি চুপচাপ নিশ্বাসের প্রতিটি শব্দ শুনতে লাগলো, আর চিৎকার করে বললো,

– ভাবিনি আর কখনো কাউকে বিশ্বাস করতে পারবো।

ছেলেটি কপালে আলতো চুমু দিয়ে নির্ভরতার হাত মাথায় রেখে বললো,

: আমিও ভাবিনি আর কখনো কাউকে ভালোবাসতে পারবো৷

কেবল গোধুলী লগ্ন সাক্ষি হয়ে থাকলো দুটো মন ভাঙা মানুষের মন জোড়ার গল্পের। মেয়েটি ভাবেনি কখনো কাউকে বিশ্বাস করতে পারবে। আর ছেলেটিও ভাবেনি, কখনো কাউকে ভালোবাসবে…!

সমাপ্তিতেও কিছু নতুন গল্পের সূচনা হয়। তবুও সব গল্পের নাম থাকে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *