
শারমিন আফরোজ বন্যা: চারদিক লাল করে সুর্যটা উঠছে ধীরে ধীরে। বেলকনি থেকে সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছে সে। এইরকম একটা ভীষণ সুন্দর সকালও যে কতো অসহ্য হয়ে উঠতে পারে! ভেতরটা ক্ষয়ে যাচ্ছে! অন্যের করা অন্যায়গুলোও নিজের সমস্ত ভালো থাকাটুকু মিথ্যা করে দেয় সময় সময়!
সারাটা রাতই ভালো ঘুম হয়নি। কিছুক্ষণ পরপর ঘুম ছুটে গেছে। ফজরের ওয়াক্তে নামাজ পড়ে আর বিছানায় যায়নি। ভেতরের ছটফটানিটুকু কাটাতে ভেবেছিল বাসায় একটা ফোন করা যাক। সিডনিতে ওরা নিশ্চয়ই উঠে পরেছে ততোক্ষণে। স্বামী সন্তানদের সাথে কথা বলে হোটেলের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে অনেকক্ষণ। মনের ভেতরের গুমোট ভাবটা কাটেনি।
ঢাকায় এসে পৌঁছেছে গত সপ্তাহে! এবার একাই এসেছে যুথি! খুব আনন্দ নিয়ে এসেছিল! প্রথম দিন চারেক চারপাশে সব সাজানো গোছানো! বিছানার চাদর, পর্দা, টেবিলের থালা-বাটিতক ফিটফাট। কোথাও কোন ছন্দপতন নেই। আশেপাশের সবাই শুধু ভালোটুকু জানতে বা দেখতে দিয়েছে!
তারপর লোভের, হিংসার, পারিবারিক রাজনীতির নখর এবং দন্তগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করেছে একটু একটু করে!
ভীষণ তৃষ্ণা নিয়ে এবার অনেকদিন পর, নিজের রুটের কাছে ফিরে এসেছিল। বহুদিন না দেখা আপনজনদের বুকে জড়িয়ে ধরতে ছুটে আসা। বাস্তবে খুব জোর ধাক্কা লাগল বুকে।
অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে সে লক্ষ্য করছে, এদেশের মানুষেরা, বেশিরভাগই কষ্ট না করে যেমন তেমন বেঁচে থাকতে চায়। তারপর অবলীলায় নিজের ভালো না থাকার দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে মানসিক শান্তিতে বাঁচে। এদের একদল অভাব অনটনটাকে কপালের ফের বলে মেনে নিয়ে কষ্টে-শিষ্টে জীবনটাকে টেনে নেয় মৃত্যু অবধি। অন্য একদল, পরিশ্রম করে সফল হওয়া মানুষগুলোকে ঈর্ষা করে। তাদের ভেঙে খাওয়ার চেষ্টা চালায় সর্বক্ষণ। ব্যর্থ হলে, নিজের নানান কর্মকাণ্ড দিয়ে, দিনরাত অশান্তি তৈরি করে রাখে। অন্যের কষ্ট করে তৈরি করা সুখ, বিনষ্ট করে দিয়ে নিজে আবার সেই নোংরা গর্তেই পরে থাকে আনন্দ নিয়ে।
অথচ তার দেখা বর্তমান পৃথিবী কতো অন্যরকম।
তার বাচ্চাদের প্রাইমারি স্কুলের গেটে লম্বা লাঠি হাতে দাঁড়ানো বয়স্ক মানুষটাকে মনে পরে। সিডনিতে এসে অবধি খুব বেশি হলে দু/তিন দিন তাকে দ্যাখেনি সে। এছাড়া রোদ বৃষ্টি ঝড়, রোজ তার সম্ভাষণ পেয়ে দিন শুরু হতো। সে দাঁড়িয়ে থাকে স্কুলের গেটের বিপরীত পারে। সব কর্মীদের মতো তার পরনেও একটা ইউনিফর্ম। পায়ে হেঁটে আসা বাচ্চাগুলোকে এপার থেকে স্কুলের গেটে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়াটাই তার কাজ। একটা বাচ্চা এসে দাঁড়ালেই সে তার লাঠিটা নামিয়ে দেয় পথে। দ্রুতগামী গাড়িগুলো স্কুলের কাছাকাছি এসে এমনিতেই স্লো হয়ে যায়। তার ওপর মানুষটার বাড়িয়ে দেয়া স্টিক দেখে গাড়িগুলো অনেক দূরেই থেমে যায়। বাচ্চারা নিরাপদে পার হতে হতে বুড়ো মানুষটাকে বলে, ‘গুড মর্নিং! হাউ আর ইউ?’ অথবা কখনো বৃদ্ধের সম্ভাষণের প্রতি উত্তরে বলে, ‘ফাইন। থ্যাঙ্কু! হাউ আর ইউ?’
সিডনির শেষ হয়ে আসা শীত ঢাকার মাঘের শীতের চেয়েও তীব্র। আগস্টের তেমনি এক রাতে যুথি এসেছিল এদেশে। রাত নটায় বাংলাদেশের গ্রামের মতো আলোহীন রাস্তায় জোনাকি পোকার দেখা মিলেছিল। দিনের আলোয় দেখেছিল পুরো গ্যালওয়ে স্ট্রিটটা ম্যাপললিফ গাছের ছাউনি দিয়ে ঢাকা। শহরের ডিজাইন কিনা যুথি যদিও সেটা জানে না। কিন্তু সে লক্ষ্য করে, পুরো রাস্তার এপাশ-ওপাশ দুপাশ জুড়েই ম্যাপললিফ ট্রি। দুপাশের পাতারা ছাতার মতোই বেস্টনি তৈরি করে আকাশ ঢেকে ফেলেছে। পুরো রাস্তাটা তাই সারাদিন ছায়াঘেরা। বাসা থেকে স্কুলের হাঁটা পথে দূরত্ব ৩ মিনিটেরও কম। এখানে এসে শুরুতে যুথি যেহেতু কোন কাজে যোগ দেয়নি, বাচ্চাদের ড্রপ অ্যান্ড পিক সে-ই করত। বছরজুড়ে বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আর ফিরে আসার সময় গুলোতে চারটা ঋতুর পরিবর্তনে সে কেবল বিস্মিত হয়েছে ম্যাপললিফের পাতার রং পরিবর্তন দেখে। যে কোন ফুলের সৌন্দর্যকেও হার মানায় কোন রকম প্রতিযোগিতা ছাড়াই। সবুজ থেকে টকটকে লাল তারপর হলুদ হয়ে সোনালী হয়ে ঝরে পরা এবং মড়মড় শব্দে পায়ের নীচে তার স্বঃশব্দ অস্তিত্বের জানান দেওয়া, যেন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেকে, নিজের অস্তিত্বকে স্পষ্ট করে রাখা।
এখানকার মানুষগুলোকেও সে এমনই দেখেছে, ছোট একটা পারসেন্টেজের ব্যতিক্রম ছাড়া। এরা যেন জীবনের অপচয়কে মেনে নিতে পারে না।
সে নিজের দেশের মানুষগুলোর কথা ভাবে, এদের সাথে তুলনামূলক ভাবনা। যদিও সে জানে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি চলকের সহগে বিশাল ব্যবধান রয়েছে দুটো দেশের। তবুও সে অনুভব করে মানসিক সহগেও সেই একই অনুপাতে ব্যবধান।
প্রথম প্রথম বাচ্চা-পারাপারকারী বৃদ্ধের জন্য তার বুকের ভেতর জ্বালা হতো। মনে হতো, আহা! এদেশের সন্তানেরা বাবা-মাকে দেখে না, এই শেষ বয়সেও কাজ করতে হচ্ছে! কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার ভুল ভেঙেছে। এদেশের সরকারই তো সব সিনিয়র সিটিজেনের দায়িত্ব নিয়েছে, তাহলে কেন উনি এখনো উপার্জন করেন! বা কেন উনি পায়ের ওপর পা তুলে বসে নেই??!!
নিজের চেনা জগতটার সাথে আকাশ পাতাল ফারাক এখানে। হ্যাঁ, এরা মদ খায়। উইক অ্যান্ডে মাতাল হয়। কিন্তু উইক ডেইজে এরা কাজ করে। সেটা শুধু উপার্জনের জন্যে নয়। নানাবিধ পজিটিভ রিসন। কতো ভলান্টিয়ার জব এখানে। এদের গির্জাগুলোতে নানারকম সোশ্যাল ওয়ার্ক হয়। কেউ কেউ বিভিন্ন দেশ থেকে মাইগ্রেট করা ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষদের সহজ কথ্য ইংরেজি শেখায়, যেন তারা শপিংটুকু করতে পারে, একটা ছোটখাটো কাজের ইন্টারভিউ দিতে পারে, বাচ্চা স্কুলের টিচারদের কথা বুঝতে পারে।
এইরকম একটা ক্লাসে সে শিক্ষার্থী হিসাবে যোগ দিয়ে আরও অভিভূত হয়েছিল। এখানে যারা শিক্ষক হিসাবে আসেন তাদের সবার বয়স ৯০ এর বেশি। একজন ৯৬ বছরের মানুষ, কোন রকম পারিশ্রমিক তো নয়ই, উল্টো নিজের তেল পুরিয়ে সপ্তাহে দুদিন নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে আসেন ক্লাস করাতে। ৭/৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৩/৪ জন শিক্ষক। কতরকম গল্প হয়, ‘নিজের কথা বলো’ টপিকসের মধ্য দিয়ে। জানা হয়, একাকিত্বকে বোঝা না বানিয়ে, কি করে কাজে লাগায় এরা। বই পড়ে নিয়মিত। টিভি দেখতে দেখতে উল বোনে, পেঙ্গুইনের জন্য মাফলার বা সোয়েটার। সাপ্তাহিক নানারকম ভলান্টিয়ার সার্ভিস। আবার কখনও নাতি নাতনিরা সময় কাটাতে আসে। তখন তারা কিছু একটা বেক করে। বাড়ির বারান্দায় কয়েকটা ফুলের গাছের যত্ন নিয়ে সকাল আর বিকেলটা কাটে। ছকে বাধা, অথচ কর্মময় জীবন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, যদি না একেবারে বিছানায় পরে যায়।
দেশের তুলনা বাদ দিয়ে, যুথি শুধু নিজের আশপাশের দিকে তাকায়। তার বড় বড় নিঃশ্বাস পরে। তাদের সমাজে বেকার থাকাটা এক ধরনের ফ্যাশন। প্রত্যেকটা পরিবারে এমন দু’একজন পাওয়া যাবে, যারা কিছুই করে না। কিচ্ছু না। কারণ এদের কেউ কেউ একটা বয়সে নিজের যোগ্যতার সমমানের কাজ চায়নি, বা নিজেকে স্বপ্নের সমান যোগ্যই করে তুলতে পারেনি, বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের নিশ্চয়তায় কাজ করার প্রয়োজনই পরেনি। জীবনের কি ভীষণ অপচয়!
এরা কোনদিন নিজেদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া এই শত-হাজার ঘন্টা ওয়ার্কিং আওয়ার নিয়ে মাথা-ই ঘামায়নি। এরা যদি শুধু সপ্তাহে ২ ঘন্টা ভলান্টিয়ার ওয়ার্ক করতো, একটা মসজিদে বসে সামাজিক উন্নয়নের জন্য দু’চারটা নীতিকথা বলা, একটা স্কুলে বিনে-মাগনা গানের টিচার হওয়া, একটা বস্তিতে নিত্যকার জীবনের খরচাপাতির হিসাব রাখার মতো অংক করতে শেখানো, একটা পতিত জমিতে কিছু লাউ চারা বুনে তা গরীবের মধ্যে বিলিয়ে দাও…। বড় বড় কাজের কথা না হয় নাই ভাবল। শুধু ছোট ছোট কাজ করেই জীবনকে কতো মূল্যবান করে তোলা যায়!
বাস্তব চিত্র ঠিক তার উল্টো।
অনেক দরিদ্র মানুষের সাথে খুব কাছ থেকে মিশে সে একটা জিনিস বুঝেছে… এরা নিজেদের ভাগ্য ফেরাতেই চায় না। থোক টাকা দিয়ে, টাকাটা খাটিয়ে পরিশ্রম করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্ল্যান দিয়ে বার বার ব্যর্থ হয়েছে সে। হ্যাঁ, নিজেকেই ব্যর্থ মনে হয় তার।
সক্ষম সব মানুষ যদি তার প্রতিটা দিনের কিছুটা সময়ও কোন গঠনমূলক কাজে ব্যয় করতো! হ্যাঁ, সবার সময়ের বা কাজের পারিশ্রমিক সমান নয়। নাই বা হলো। কিছুই যদি না করো, পারিশ্রমিক তো শুন্য।
কাল রাতের ফোন কলটা ভুলতে পারছে না! সচরাচর এই ফোনকলগুলো আসে, যখন সে একটা সুন্দর সময় কাটাতে চায়, তখন! দু’দিনের জন্য বন্ধুদের সাথে গতকালই এসে পৌঁছেছিল কক্সবাজার! বিচে চমৎকার সন্ধ্যাটা পার করে হোটেলে ফিরে ফুরফুরে মনে ডিনার সারছিল। ঠিক তখন কঁকিয়ে উঠেছিল মোবাইল। বছরের পর বছর। একই চাহিদা ‘বিশাল এক সম্ভাবণা সামনে, খালি অল্প কিছু টাকার জন্যই আটকে আছে!’ সময়ের সাথে সাথে কেবল টাকার অংকটা বেড়েছে। মনটা খিঁচে গিয়েছিল তার। কারণ সে জানে, এই টাকাটাও সে দিবে, কিন্তু কাজটা হবে না!
ড্রেসটা পাল্টে নিয়ে সে লবিতে নেমে আসে, এখানেই সকালে সবার মিট করার কথা। হোটেলটা বিচের খুব কাছে হওয়ায় সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার শব্দ শুনতে পায় সে। দূর থেকে এক এক করে বন্ধুদের পরিবারসহ এগিয়ে আসতে দেখে সে। পারিবারিক হাসি মুখগুলোর ছোঁয়া লাগে তার মনে। একটু এগিয়ে সে একটা বাচ্চাকে কোলে তুলে নেয়। আস্তে আস্তে মন থেকে তিক্ততাটুকু হালকা হতে থাকে! দলের সাথে সে আগায় জীবনের দিকে!
















Leave a Reply