জুঁই

শারমিন আফরোজ বন্যা

শারমিন আফরোজ বন্যা: পেনান্টহিলের আগে চার্চ স্ট্রিটের চার রাস্তার মোড়ে সে ওপাল কার্ডটাকে পাঞ্চ করে বাসের ফ্রন্ট ডোর দিয়ে নেমে গেল। রাত প্রায় এগারোটা। পুরো প্যারামাট্টা ঘুমিয়ে পরেছে। যদিও পরের স্টপেজটা ঠিক পেনান্টহিল রোডেই। সেটা তার বাড়িটা ক্রস করে অল্প আরেকটু পথ এগুতে হয়। কি এক অদ্ভূত যুক্তিতে জুঁই কখনো পিছনে হাঁটতে চায় না। তাই পরের স্টপেজটা বাড়ি থেকে খানিকটা কাছে হলেও সে সাধারণত চার্চ স্ট্রিটেই নামে।

বাস থেকে নেমেই, সে দ্রুত পা চালাল রাস্তার ক্রসিং পুলের দিকে। রাতের প্যারামাট্টা খুব বেশি আলোকোজ্জ্বল নয়। বরং বেশ একটা ভূতুড়ে আবেশ। আধো আলো, আধো অন্ধকার।  ক্রসিং সিগন্যালের এই বাটন চেপে আলো জ্বালানোর ব্যাপারটায় সে এখনও নতুনত্ব খুঁজে পায়। পুরো রাস্তাটা ফাঁকা। তাকে নামিয়ে দিয়ে বাসটা সাঁই সাঁই করে চলে গেছে অনেক দূর। চার লেনের চওড়া রাস্তাটা সোজা চলে গেছে। যার ডানে পেনান্টহিল হাইওয়ে। যতদূর চোখ যায় ছ’টা রাস্তার কোনটাতেই গাড়ির হেডলাইট চোখে পরে না।  এমনকি রাস্তার এপারে বা ওপারে, সে একা একজন মানুষ। তবুও সে প্যাডেসট্রেইন সিগন্যালটা সবুজ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে, দৌড়ে রাস্তা পার হবার অভ্যাসটা চলে গেছে। বাংলাদেশ থেকে সে এসেছে দেড়বছর হলো। এ ক’দিনে তারও অনেক অভ্যাস বদলেছে। তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যেই তার জন্য রাস্তা পারাপারের সবুজ মানুষটি দেখা দেবে পোলের বোর্ডে। তার আগে সে নামবে না পথে।

বাতিটা জ্বলে উঠতেই সে পা রাখলো রাস্তায়। ঠিক তক্ষুনি কেউ একজন তার পেছন থেকে বাংলায় কথা বলে উঠলো, এক্সকিউজ মি, আমি ঢাকার মেয়ে, আপনিও কি?

সে একটু চমকালো। ভয় পাওয়ার স্বভাব তার নয়। হাঁটতে হাঁটতেই সে জানালো, সে বাংলাদেশী। সে আড়চোখে দেখলো, একটা বাচ্চা মেয়ে। সম্ভবত ২০ বছর বয়স। হয়ত গ্র্যাজুয়েশনের জন্য এসেছে এদেশে। দেখে বোঝা যায়, তার মতো মেয়েটাও এদেশে প্রথম জেনারেশন।

মেয়েটা বলে চলেছে, আপনি বাসে যখন ফোনে কথা বলছিলেন, বাংলা শুনে এতো আপন লাগলো। বাংলাদেশে আপনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান সেখানে কিছুদিন আমার ভাইয়াও কাজ করেছ!

তারপর একটা নাম বললো সে। এবং জুঁই অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে ভাবলো, পৃথিবীটা এখন আর আন্তর্জাতিক নাই যেন। বর্ডারের প্রয়োজন বোধহয় শিগগিরই ফুরাবে।

চার্চ স্ট্রিট যেখানে পেনান্টহিলে মোড় নিল, সেই কর্নারটাতে হাতের বায়ে একটা সিমেট্রি। সিমেট্রি বা কবরস্থানও যে এতো সুন্দর, নিরিবিলি, মনে হয় বসে থাকলে মনটা স্থির হবে। তারপর বেলমোর পার্ক এবং তারও পর হলো জুঁই এর মন হারানো দূরত্বের বিশালতা। এ পথে তার যাওয়া হলো না এখনো। পেনান্টহিল থেকে সরেল লেন হাতের ডানে। সরেল লেনে তাদের বাড়িটা হাতের বামে। অ্যাপার্টমেন্ট পদ্ধতির। ওরা তিনতলায়। কিচেন লাগোয়া অসাধারণ এক ওপেন টেরাস। ওপরে আর কোন ফ্লোর নেই। সেই টেরাসে বসে চোখ যতদূর দেখে, পুরোটাই পেনান্টহিল রোড। এ রাস্তাটা কোথায় মিশেছে সে জানে না। গুগল করলেই জানা যায়। কিন্ত জুঁই জানতে চায় না। ওটা তার হারিয়ে যাওয়ার পথ। সব মানুষেরই একটা পথ থাকা চাই জীবনে, যেখানে সে চাইলে সাময়িক হারিয়ে যেতে পারে।

রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে থেকে কত শেষরাতের ভোর হওয়া দ্যাখে জুঁই। এমন একেকটা সকালের জন্যও যেন বেঁচে থাকা যায়। বেলমোর পার্ক আর তারপর রাস্তার সীমানা ঘেষে কন্টিনিউস চলে যাওয়া সারি সারি গাছ সমস্ত দিগন্ত এক ভূতুরে অন্ধকারে ঢেকে থাকে রাতে। ফাঁকে ফাঁকে স্ট্রিট লাইটগুলোর আলো মোটেই সেই জঙ্গুলে আঁধারকে ঘোচাতে পারে না। অথচ বেলমোর পার্কের গাছের পাতাগুলোতে যেন আগুন লেগে যায়, যখন সুর্যটা মাটি ফুরে বেরিয়ে আসে।

এলাকাটা পুরোটাই পাহাড়ি। পার্কটা টিলার মতো উঁচু। সূর্যের আলো যখন টেরাসে হাল্কা চাদর গায়ে বসে থাকা জুঁই-এর পায়ে এসে পরে, এক অদ্ভূত স্বর্গীয় অনুভূতি। ভালোবাসা শুধু মানুষে মানুষেই হয়, জুঁই এর তা মনে হয় না আজকাল। তার মনে হয়, প্রকৃতির সাথে এক অদ্ভূত প্রেম হতে পারে মানুষের। সেখানেও ভাঙন থাকতে পারে, সেখানেও মিলন। সেখানেও অনুভূতি বদলে যেতে পারে, দু পক্ষেই। সিডনির পথে পথে জেসমিনের (এদেশে এসে তার নামটা পাল্টেছে দু’দফায়, জেসমিন তারপর জ্যাসি) জন্য প্রেম ছড়িয়ে রাখা। সবচেয়ে বেশি টানে এই হারিয়ে যাওয়া পথটা।

প্যনান্টহিল রোড ধরে বাড়ির দিকে কিছুদূর এগুলেই অ্যালবার্ড স্ট্রিট। জেসমিনের মনে রাখার জন্যে জিরো পয়েন্ট। এরপর ইসাবেলা। তারপর গ্ল্যাডস্টোন স্ট্রিট। তারপর যেন এক অজানা পৃথিবী। দরকার হয় না, তাই সে পথটা আজো হাঁটা হয়নি। অ্যালবার্ট স্ট্রিট এলেই সে সচেতন হয়। এরপর ইসাবেলা আর তারপর খুব মজার একটা ব্যাপার। শুধু তাদের বাড়িটার সামনে দিয়ে চলে গেছে যে রাস্তাটা সেটা স্ট্রিট নয়। সেটা লেন। পুরো এলাকায় ঐ একটাই লেন চোখে পরবে। সরেল লেন। সরেল লেনে কেবল দুটো প্লট। প্রথমটায় তাদের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। তারপরের প্লটটা একটা কমিউনিটি ভেজিটেবল ফিল্ড। যার যেটা ইচ্ছা বুনছে, কোন বরাদ্দ নাই আবার কোন কেওয়াজও নাই। আর ঠিক অপজিট প্লটটায় বিশাল জায়গা জুড়ে তার অত্যন্ত প্রিয় জাকারান্ডা গাছ। যখন পার্পল কালারে ফুলগুলো ফোটে তখন পাতা দেখা যায় না, বাংলাদেশের কৃষ্ণচুড়ার মতোই।

সরেল লেন পর্যন্ত আসতে তার ৩/৪ মিনিট লাগে। কিন্তু এ পথটা সে বুঝে বুঝে হাঁটে। প্যারামাটার লেন বা স্ট্রিটে একেকটাতে একেক ধরনের গাছ। এই পথটুকুতে, ইসাবেলা থেকে সরেল, বাড়িগুলোর তার দিয়ে তৈরি করা দেয়াল জুড়ে জেসমিন ফুল। নিজের নামের ফুল। অসাধারণ সুবাস আর কি স্নিগ্ধ দেখতে। মাঝে মাঝে এক বা দুটো ফুলসহ ডাল সে ভেঙে নেয়। খুব বড় অপরাধ, কিন্ত সে আটকাতে পারে না। একটা ফুলদানিতে একগাদা পাতার ভিড়ে ফুটে থাকা সাদা সাদা ফুলগুলো সারাঘরকে মম গন্ধে ভরে রাখে কয়েকটা দিন। ভালোবাসা, ভালোবাসা।

দু’জনে গল্প করতে করতে আজ পথটা শুরু হতেই যেন শেষ হয়ে গেল। জুঁই বললো, তোমার নামটা তো জানা হলো না। ও আবার সেই হাসিটা দিয়ে বললো, চন্দ্রিমা।

জুঁই দেখেছে, মেয়েদের নামগুলো ভারি ভালোবাসা মাখানো হয়। আনন্দ, হাসি, খুশি, সুখী! যারা নামটা রাখে, শেষ পর্যন্ত তাদের সাথে থাকাই হয় না মেয়েগুলোর। কোথায় অচেনা কোন অন্যদের বাড়িতে গিয়ে শুরু হয় সত্যিকার জীবন। এইখানেও প্রকৃতিগতভাবেই, বা সমাজপ্রণেতাদের কারসাজিতে পুরুষেরা সুবিধাজনক অবস্থায়। জন্মের পর থেকেই পুরুষেরা জানে, তাদের বাড়ি কোনটা। তারা ছোটবেলা থেকে যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, সেখান থেকে তাকে শিকড়সহ উপরে নেয়ার কোন ব্যাপার স্যাপার নেই। যে বিছানায় মা বাবা ভাই বোনের সাথে গড়িয়ে বড় হয়েছে সেটা তাকে ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হয় না। রোজকার অতি চেনা সূর্যটাই একই ভালোবাসায তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। একই নাস্তার টেবিল। একই পথ দিয়ে বাড়ি ফেরা। একই কলিংবেলের মিষ্টি শব্দ। একই বন্ধুর সাথে আমৃত্যু উৎসব। পালা,  পার্বণ…। আর মেয়েদের পরিপূর্ণ বয়সে এসে সবটাই বদলে ফেলা। মেনে নেয়া, মানিয়ে চলা, বদলে যাওয়া…!

চন্দ্রিমা তার সাথে মোবাইল নম্বর অদলবদল করে বিদায় নেয়। গ্ল্যাডস্টোন স্ট্রিটে তার বাসা। এখানে রাস্তাগুলো পরিকল্পিত। সরেল লেন দিয়ে যদিও চন্দ্রিমা যায় না কখনো, কিন্তু তাতে আজ তার পথ বেড়ে যাবে না। সরেল লেন গিয়ে মিশেছে সরেল স্ট্রিটে। সেখান থেকে বামে এগুলেই তার স্ট্রিট।

শুরুর দিকে পথগুলো গোলকধাঁধাঁর মতো লাগতো জুঁইয়ের কাছে। এই সরেল স্ট্রিটে বামে চলে গিয়ে একটা স্ট্রিট পার হয়েই একটু বাঁকা হয়ে মিশে গেছে পেনান্টহিলে আর ডানে চলে গেছে অনেক দূর। তখন স্ট্রিটগুলো উল্টে যায়… ইসাবেলা, অ্যালবার্ট,  হেরল্ড, ফিনেল, গ্রস, রোজ, ভিক্টোরিয়া। গাড়ি না থাকায় প্রচুর হাঁটতে হয় তাকে। সবসময় সব রোডে ফ্রি সাটেলের স্টপেজ থাকে না। পেইড বাসগুলোর স্টপেজও বাসা বা ওয়ার্কপ্লেস থেকে দূরেই হয়। মজার ব্যাপার হল, এখানে এই নর্থ প্যারামাটায়, শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত সব ঋতুতেই পথগুলো যেন কোন শিল্পীর আঁকা ছবি। ডেসুডিয়াস গাছগুলোর রং বদলানো, সবুজ থেকে হলুদ, তারপর কমলা,  তারপর আগুনে লাল। তারপর পাতাশূন্য গাছগুলোর ডালপালা আকাশে অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবি আঁকে। আবার যখন জাকারান্ডা ফোটে, পুরো সিডনির সর্বত্র পার্পল কালারে আকাশ ঢেকে দেয়া পথ। গামট্রির খোলস বদলও কি মোহনীয়…! কতবার এমন হয়েছে, হাঁটতে হাঁটতে সে তার গন্তব্য পেরিয়ে চলে এসেছে অনেকদূর…। ভালোবাসা, ভালোবাসা।

রাতের সিডনি

একটা হট শাওয়ার নিয়ে নামাজটা পড়ে জুঁই। তারপর একটা ভেজিটেবল স্যান্ডউইচ আর একমগ ঘন গরম দুধে সামান্য moccona কফি মেশায়। খাবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে হেলান চেয়ারটায় গা এলিয়ে দেয়। পাশের ছোট্ট টুলটাতে কফি মগটা রেখে ডান হাতে খাবার আর বা হাতে মোবাইল। সারা পৃথিবী মুহূর্তের মধ্যে সামনে চলে আসে। কে নানি হলো, কার হার্টের বাইপাস সার্জারি, কে সবজি খিচুড়ি আর গরুর মাংস খেয়ে আনন্দ পেল, কার ছেলে/মেয়েটা ভালো একটা চাকরি পেয়ে দূরে জয়েন করতে যাচ্ছে, মা-বাবা হাসি মুখে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় দিচ্ছে, কোথায় লাশ পাওয়া গেল এক ধর্ষিতার, বাস খাদে পরে এক পরিবারের চারজনের মৃত্যু, ব্যাগে ভরে ফেলে যাওয়া নবজাতক…, মন যতক্ষণ নিতে পারে সে দেখে। যখন আর নিতে পারে না, বোধটুকু লিখে ফেলে স্ট্যাটাসে, অথবা হেডফোন কানে লাগিয়ে কবিতা শুনতে শুনতে আকাশ দেখে, মনটাকে ছেড়ে দেয় পেনান্টহিলের রাস্তায়…।

একটা মেসেজ নোটিফিকেশন। আবার একটা। মোবাইলটা হাতে নিয়ে চশমা খোঁজে। দেখে চন্দ্রিমা মেসেজ করেছে। লম্বা মেসেজ। খুব অবাক লাগে তার। আজকেই পরিচয়। মেসেজ না পড়েই সে সিদ্ধান্তে আসে, হয় চন্দ্রিমা বোকা অথবা নিঃসঙ্গ।

মেসেজটা যে তাকে এমনভাবে ঝাঁকুনি দেবে, তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। সে মেসেজটা পড়ছে, বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা। চোখের কোন জ্বালা করে ওঠে। নিজেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে কথাগুলোর মধ্যে। লেখা খুব গোছানো নয়। কিন্তু বক্তব্য স্পষ্ট।

সে স্পষ্ট দেখতে পায়, এক তরুণী বহু ব্যবহৃত জামা আর সামান্য একটা claw clip দিয়ে চুলগুলো পিছনে টেনে নিজেকে সাজিয়ে দেয়ালে ঝোলানো মাঝারি সাইজের একটা আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে আছে। তার নিজেকে একটুও সুন্দর লাগছে না। চেহারার কোথাও কোন অসাধারণত্ব নাই। অদ্ভূত সুন্দর চোখ নয়। সাদামাটা একটা নাক। চুলেও কোন গ্ল্যামার নাই। তার উপর সাজতে সে ভালোও বাসে না। আবার সে কৃষ্ণকলিও নয়। দুধে-আলতাতো নয়ই… মোটকথা আয়নায় তাকিয়ে থাকা চোখে আত্মবিশ্বাস নাই একফোঁটাও।

স্কুল কলেজ তাই সে পেরিয়ে এসেছে নির্বিঘ্নে। কেউ কোনদিন পথ আটকে দাঁড়ায়নি। কোনদিন একটা চিরকুট নয়। না কোন বই আদান-প্রদানের চেষ্টা।

সে খুব পড়তো। পরিশ্রম করতো। ব্যস্ত থাকতো। বড় হতে চাইতো। একটা জটলায় যুক্তিতে তর্কে তাকে থামানো যেত না। কিন্তু সেই তর্কের ফাঁকে কেউ যদি দু’পলক বেশি তার দিকে তাকিয়ে থাকতো, সাথে সাথে সে সন্দিহান হয়ে উঠতো, আশ্চর্য। আবেগ নয়, থমকে যেত সে। ভুল হচ্ছে, কোথাও ভুল হচ্ছে। তাকে কেন কেউ মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখবে??!!

কোন দাওয়াত বাড়ির ভিড়েও, সে সবসময় ধরেই নিত সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা তার জন্য নয়। প্রেম ভালোবাসা এসব তার জন্য নয়। কারো চোখ দু’বার তার দিকে তাকালে সে পালিয়ে এসেছে সে জায়গা থেকে। বিশ্বাস হয়নি সে দৃষ্টিকে।

অথচ রিলেশন ব্যাপারটা তার কাছে কতো সম্মানের। একটা বিশুদ্ধ সম্পর্কের জন্য তার ভেতরটা কাঁদতো। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস ছিল না তার। মনে হতো, সে তুচ্ছ, খুবই তুচ্ছ!!

এই তুচ্ছতা জড়িয়ে ছিল তার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ওপরও। বাবা ছিল না। মা আর মেয়ের অনিশ্চিত জীবন। জীবনযুদ্ধ। যুদ্ধজয়। তারপর আজকের জেসমিন বা জ্যাসি হয়ে ওঠা। আজ যখন সে আয়নায় তাকায়, এই মধ্যবয়সে কি ভীষণ মিষ্টি লাগে নিজেকে। যত্নে ত্বক হয়েছে লাবন্যময়। পার্লারে কাটা চুল থাকে থাকে পরে আছে ঘাড়ের ওপর। গায়ের রংটাও কতো সুন্দর, পাকা গমের মতো। আজকের সৌন্দর্যে মিশে আছে শিক্ষা, উপার্জন, আত্মনির্ভরশীলতা।

আজ চন্দ্রিমা দাঁড়িয়ে আছে সেই ভাঙা আয়নার সামনে। ভাসমান। প্রপার কাগজ নেই এদেশে থাকবার। খুব ছোটবেলায় বাবা মারা গেলে মা তাকে নিয়ে মামার কাছে এসে উঠেছিল। মামার তিন ছেলে। মেয়ে ছিল না। মামি তাকে দত্তক নিয়েছিল কাগজে কলমে। মামাত ভাইয়েরা বয়সে অনেকটাই বড় ছিল। একে একে তিনজনকেই মামা-মামী সিডনিতে পাঠিয়ে দিল। পড়াশোনার চেয়েও, দেশ থেকেই চলে যাওয়াটা ছিল মূল উদ্দেশ্য। তিনজনকে পাঠাতে গিয়ে জমানো টাকা আর রইলো না কিছু। মামা মারা গেলেন। এবার ভাইয়েরা মাকে সিডনিতে নিয়ে যাবে, মামি শর্ত দিলেন চন্দ্রিমাকে সহ নিতে হবে। এক বছরের টুরিস্ট ভিসায় তারা এসেছে ছ’মাস হল। এর মধ্যে সে aged care সার্টিফিকেট-৪ কোর্স করে একটা এজেন্সির মাধ্যমে একটা কাজ পেয়েছে। প্রতিদিন দু ঘন্টা। বাসে যাতায়াত করে খুব বেশি কিছু থাকে না। আরেকটা কাজ তার খুব প্রয়োজন। এখানে ভাইয়েদের সংসারেও অনেকগুলো সদস্য। তিন ভাবীকে খুশি রেখে চলা। শোবার জন্য, পড়তে বসার জন্য একটু একার জায়গা… কত ছোট ছোট বিষয়.. প্রতিদিন। গ্রামের বাড়িতে তার নিজের মা একা আছেন। তাকেও কিছু টাকা পাঠাতে হয়। ভাইয়েরা হিমশিম খাচ্ছে।

চন্দ্রিমা একটা সিভি পাঠিয়েছে। এদেশে কাগজ আছে এমন একটা ছেলের সাথে যদি বিয়ে হতো… বয়স যাই হোক… ডিভোর্স হলেও সমস্যা নাই… ২/১টা ছেলেমেয়েও পালতে পারবে সে…।

জুঁই এর ভেতরটা নতুন করে ভেঙে চুড়ে একাকার হতে থাকে। সে জানে, চন্দ্রিমার মতো এতো সাধারণ চেহারার একটা মেয়েকে কোন PR পাওয়া ছেলে বিয়ে করতে রাজি হবে না। তার খুব ইচ্ছা হলো একটা মিরাকল ঘটিয়ে ফেলতে! আল্লাহর কাছে সেজদায় সে আজ বারবার চন্দ্রিমার ভালো চাইল।

ভোরের দিকে হাল্কা কুয়াশা পরতে শুরু করেছে। আর মনটাও বসে বসে ভোর দেখায় কোন আনন্দই খুঁজে পেল না। বিছানায় এসেও কেবল ওলট-পালট। বাসে সে কি এমন কথা বলেছিল মনে করতে চেষ্টা করে। হ্যাঁ, সে একজন ডিভোর্সড বাঙালি ছেলের বিয়ে নিয়েই কথা বলছিল। কতোটা অসহায়তা! সেইটুকু খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে হয়।

সে ছেলেটা অনেক বয়স্ক, ডিভোর্সড। কিন্ত তবুও সে একজন অবিবাহিত সুন্দর দেখতে অল্প বয়সি মেয়ে চায়।

এরপর, পরপর ক’দিনই চন্দ্রিমার সাথে তার বাসে দেখা হতে লাগল। রোজই চন্দ্রিমা আরও একটু বেশি বিষন্ন, আরো একটু অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। দেখেই বোঝা যায়, যুদ্ধ করার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলছে সে।

এরকমই একরাতে বাস থেকে নামলো যখন, মুষলধারে বৃষ্টি। আবহাওয়া জানা থাকে বলেই দু’জনার ব্যাগ থেকেই রেইন কোট বের হলো। জুঁই বললো, বাড়িতে একটা ফোন করে দিলে হয় না, কাল তো শনিবার। কাজ নেই। রাতটা দুজনে গল্প করে কাটাই।

চন্দ্রিমা ভীষণ এক্সাইটেড হয়ে পরল। কারণ তার ভীষণ থাকতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ভাইয়ারা কিছুতেই মানবে না।

শেষে ঠিক হলো আগে সরেল লেন যাওয়া যাক। পথ থেকে ওরা একটা লেবানিজ হালাল বিফ পিৎজা কিনলো। চারটা হানি ড্রাম স্টিক আর একটা ঢাউস সাইজ স্প্রাইট।

বৃষ্টিতে রেইনকোটের উপর ছাতা মেলতে হলো খাবারগুলো বাঁচাতে। তারপর তাদের হাঁটা দেখে বোঝা গেল তারা খুব দ্রুত পৌঁছাতে চায় না।

এর আগেও চন্দ্রিমা এসেছে একদিন। জানে জুঁই শুধু তার মাকে নিয়ে থাকে এই ফ্লাটটাতে। যুদ্ধজয়ী এক মা। কিন্তু সবটুকু জয় যেন হলো না। মেয়েটাকে কিছুতেই বিয়েতে রাজি করাতে পারেননি। কতো যোগ্য ঘর এসেছে, মেয়ের অসাধারণ রেজাল্টের পর, বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করার পর। কিন্তু মেয়ের শর্ত ছিল অদ্ভূত। সে যেহেতু বিয়ের পর সংসার থেকে বেরিয়ে এসে নতুন জীবন গড়বে, ছেলেকেও তাই করতে হবে।  সে যেহেতু তার মায়ের একমাত্র সন্তান মা থাকবে তার সাথে,  নিজের বাড়ির মতো। খুব কম মেয়েরই স্বামীর বাড়িটা নিজের হয়, তার কি হবে সে তো জানে না, সেখানে মায়ের অসম্মান হবার সমূহ সম্ভাবনা। ছেলের মা বাবার জন্যও একই কথা। নিজেদের বাড়ি আছে এমন ছেলেও জুঁইয়ের মাকে নিজেদের কাছে রাখতে রাজি হয়েছিল। জুঁই রাজি হয় নি। যুক্তি একটাই, আমার সবটুকু যদি বদলে যায়, তবে তোমারটা নয় কেন? সে নিজের কোয়াটারেও থাকতে রাজি ছিল না। বিয়ে হলে নতুন একটা বাড়ি ভাড়া করা হবে। যেখানে পর্যাপ্ত আলো বাতাস থাকবে মায়ের জন্য, শ্বশুর শাশুড়ীর জন্য। প্রয়োজনে স্বামীর অন্য যে কোন ডিপেন্ডেডের জন্য।

তারুণ্যে এক বুক ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করেছে শুধু একজন সত্যিকার মানুষের। পায় নি। যোগ্য হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত কারো চোখের মুগ্ধতা টানতে পারেনি। সত্যি হলো তেমন করে কেউ চায়ও নি। তারই পাশে তার বান্ধবী বা কাজিনের হাত চেয়েছে। সেটা পেতে তার সাহায্য চেয়েছে। দুর্ভাগা।

এমন নয় যে, ভালোবাসা হলেই আজ সে আজকের চেয়েও সুখি হতো। কিন্তু এই অদ্ভূত সুন্দর ম্যাপল লিফের দেশে ঝরে পরা লাল পাতাগুলোয় গা এলিয়ে দিয়ে, আজ হয়ত সেই সত্যিকারের ভালোবাসাটুকুর জন্য মন উদাস হতো। সত্যিকারের ভালোবাসাটুকুর স্মৃতি বুকে নিয়েও সে জানে একটা জীবন সুখেই বাঁচা যায়।

অথবা সে হয়তো এক অদ্ভূত মানুষ। কোন না পাওয়া তাকে দুঃখে ডুবিয়ে রাখতে পারে না। পাওয়াটুকুই আসল। এই যে শেষ বয়সে মাকে তার সঙ্গে রাখতে পারছে, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে? কে যেন লিখেছিলেন, ‘পাতাগুলো মরে যাবার আগেও অন্যের মনকে রাঙিয়ে দিয়ে যায়।’

পাওয়ার হিসাব মিলিয়ে সে খুব তৃপ্ত। রিয়েল লাইফে বন্ধুবিহীন নিঃসঙ্গ জীবনই তাকে নির্মল আনন্দ দেয়। এর কারণ সে প্রকৃতির কাছে এলে এদেরই অংশ হয়ে যায়। মানুষের টক্সিকতা ছুতে পারে না। কিন্তু জীবনের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে পাওয়া অসংখ্য ভারচ্যুয়াল ফ্রেন্ড আছে তার। এদের অনেকের জন্যই তীব্র ভালোবাসা। প্রতিদিন একবার খোঁজ না নিতে পারলে হৃদয়ে একটা শূন্যতা বোধ টের পায়।

কিন্তু সবমিলিয়ে সে সুখী!

চন্দ্রিমা আজকাল তার সুখে হানা দেয়। হঠাৎ হঠাৎ তাকে বিষন্ন করে। এই যে প্রায় রোজই একসাথে ফেরা, বাস স্টপেজে এসে না পেলে ফোন দেয়। অপেক্ষা করে। বাসে পাশাপাশি বসে টুকটাক রোজকার গল্প শোনে। আজ চন্দ্রিমাকে ঘরে ডেকে নেয়ার একটা গোপন প্লান ছিল মাথায়। বৃষ্টিটা আরেকটু সহজ করে দিল। চন্দ্রিমার ভাই ভাবীদের সাথেও তার পরিচয় হয়েছে। সেই বিয়ের ঘটকালিটা করতে গিয়েছিল। ওর মামী এক কথায় না বলে ছিলেন। শ্রদ্ধায় মাথাটা নুয়ে এসেছিল জেসমিনের। অন্তত মেয়েটিকে পরিবারের লোকেরা ভালোবাসে।

তাই আজ যখন মামীকে ফোন করলো, বৃষ্টিতে আটকে গেছে, কালতো ছুটিই, থাকুক আমার সাথে, মামী না করেননি।

খাওয়া দাওয়ার পর ওরা যখন বিছানায় গড়াচ্ছিল… একজন চল্লিশের সফল নারী… অন্যজন তারই আধ বয়সি যুদ্ধ শুরুর আগেই হেরে ভূত…। তাদের পরস্পরের মুখ ছিল বিপরীতমুখী। তবু মনে হচ্ছিল তারা কথা বলছে মনে মনে।

জুঁই চন্দ্রিমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে স্বগোতক্তির মতো বলেছিল, এখনই বিয়ের কথা ভেবো না। একটু কষ্ট করতে পারবি? জীবনকে একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া। আমি থাকবো সাধ্যমতো পাশে।

হাত বাড়িয়ে সাইড টেবিল থেকে একটা খাম নেয় জুঁই। চন্দ্রিমাকে দিয়ে বলে, দেখো এটা। নার্সিং ডিপ্লোমা। দেড় বছরেও করা যেতে পারে, আবার দু’বছরেও। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হিসেবে অ্যাপ্লাই করতে তোমার IELTS আবার দিতে হবে। পারটিকুলার পয়েন্ট লাগবে। গ্যারান্টর লাগবে। খরচ লাগবে!

এরমধ্যে তিনটে জিনিস আমি তোমাকে সাহায্য করব। এক. IELTS এর খরচ এবং সে জন্য প্রস্তুত করা। দুই. গ্যারান্টি বা ব্যাংক সলভেন্সি। তিন. প্রতি সেমিস্টারের ট্যুইশন ফিসটা আমি তোমাকে ধার দেব, তুমি সেটা সেমিস্টারের মধ্যেই শোধ দেবে।

‘সেটা কিভাবে সম্ভব?’ চন্দ্রিমা চিন্তিত স্বরে জানতে চায়।

‘তোমার কাজ হবে প্রথমে নিজেকে মোটিভেট করা এবং বিশ্বাস করানো যে এটা সম্ভব। এরপর ভবিষ্যত নড়বড়ে থাকবে না। হয়তো কাজ হবে হাসপাতালে। PR পেতেও নার্সিংয়ের জন্য পয়েন্ট আছে। তাই নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলাটা কঠিন হবে না।

সবচেয়ে বড় কাজটি হলো দিনে ২০ ঘন্টা পরিশ্রম করার জন্য তৈরি হওয়া। সপ্তাহে ২০ ঘন্টা কাজের পারমিশন থাকে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন্য। সেটা তুমি ভাইদের সাহায্য নিয়ে কোলস-এ ঢুকে যাও অথবা এজেন্সিগুলোতে লেগে থেকে ২০ ঘন্টার কাজ নাও। এর বাইরে প্রতিদিন পিৎজাশপ বা গ্রোসারিগুলোতে ক্যাশ পেমেন্টে কাজ করো আরও ৬/৭ ঘন্টা। বাকি সময়টা যাতায়াতের পথে বাসে, ট্রেনে ঘুমাবে। ব্যাগে বনরুটি, ফ্রুটস, ডিম সিদ্ধ, পানি, দুধ রাখবে। আর শুধু কলেজের লাইব্রেরিতে পরে থাকবে…।

পাদটীকা:

পিএইচডি শেষ করে জুঁই ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। মাকে নিয়ে ইউনিভার্সিটি কোয়াটারে তার ছিমছাম জীবন চলছে আগের মতোই নির্মল আনন্দে। মাঝে মাঝে প্যারামাটার দিনগুলো খুব মিস করে। কিন্তু সেজন্যে দুঃখ হয় না। জীবনের অদ্ভূত সুন্দর একটা সময় সেটা। হয়তো শিগগিরই একবার যেতে হবে। চন্দ্রিমার বিয়ে।  তারই ক্লাসমেটের সঙ্গে। দু’জনারই হাসপাতালে চাকরি হয়েছে। PR পেয়ে গেছে যার যার নিজস্ব যোগ্যতায়। মাঝে মাঝেই ফেসবুকে চন্দ্রিমার পোস্ট দেখে, কাজের ব্রেকে দু’কাপ কফি। কভার প্রোফাইল পাল্টে দিল একটা ফুলের বুকে। সমুদ্রের তীরের বালুতে দু’জন মানুষের ছায়া! প্রতিটা ছবি জুঁইয়ের জীবনের অপ্রাপ্তির পূর্ণতা। যোগ্য হয়ে ওঠার আগেই তারা পরস্পরকে বুঝে নিয়েছে। কোন যোগ বিয়োগ করে তৈরি নয় এ সম্পর্ক।

চন্দ্রিমা টেক্সট করেছে, বন্ধু, আমরা একটা গ্র্যনি হাউজ ভাড়া করেছি। এখন ছোট ছোট ফার্নিচার কিনে গোছাচ্ছি। এখানে তোমার স্বপ্নটা পূরণ হয়ে যাচ্ছে আমার জীবনে। হয়তো এদেশে আছি বলেই। বিয়ে করে আমাদের এই আলাদা সংসার পাতাটা এখানে কতো স্বাভাবিক। তুমি একটু সময় নিয়ে এসো। তোমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদতে ইচ্ছা করে! খুব!

জুঁই এর চোখের কোনা জ্বালা করে। সে কাঁদতে জানে না। অদ্ভূত কষ্টে বুকের ভেতরটা চেপে আসে। তারও তক্ষুণি চন্দ্রাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে খুব ইচ্ছা হয়। সে তার পরিচিত ট্রাভেল এজেন্টকে ফোন করতে মোবাইলটা হাতে নেয়।