করিডোরের মৃদু আলোয় ব্যাগ হাতড়ে লাল রংয়ের ছোট্ট গাড়ি আকারের চাবির রিংটা বের করল অনামিকা। চাবিটা ঘুরিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢোকে। বাতি জ্বালিয়ে পাশেই গাউন এবং ব্যাগ রাখার ক্লজেটে ব্যাগ আর হাত ঘড়িটা রাখে। নিজের বেডরুমে ঢুকে অ্যাটাচ বাথের গিজারটা চালু করে নিজেকে বিছানায় ছেড়ে দিল।
মাস দুয়েক হলো সে ফ্ল্যাটে উঠেছে। নিজের। অনেক স্বপ্নের। প্রতি মুহূর্তে সে শরীর এবং মন দিয়ে এর সবটুকু মাধুর্য উপভোগ করে। একজনের জন্য অনামিকার ফ্ল্যাটটা যথেষ্ট বড়। প্রায় বারোশ স্কয়ার ফিট এরিয়া। সে ইনসাইডেই পেয়েছে। তারপর কমন এরিয়া আর গ্যারেজ মিলে প্রায় পনেরশো স্কয়ারফিট।
হাউজ বিল্ডিং লোনটা অ্যালিজিবল হওয়ার পর থেকে প্রায় একটা বছর সে যে কতো ফ্ল্যাট দেখেছে, ঢাকা শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। কিন্তু প্রত্যেকটাতেই কিছু না কিছু অপছন্দের বেরিয়ে এসেছে তার দৃষ্টিতে। শেষমেষ এটা কিনল। ঠিক যেন তার স্বপ্নেরই বাস্তব চেহারা। তারপর একটু একটু করে সে ওপেন কিচেন সাজিয়েছে। চমৎকার স্টাডি, গেস্টরুম। সুন্দর একটা ঝুল বারান্দা। বারান্দাজুড়ে গার্ডেন-প্লানার দিয়ে সাজানো বাগান। আর্টিফিশিয়াল ঘাসের উপর ফেলে রাখা পিলোতে কাত হয়ে শুয়ে শুয়ে জ্যোৎস্না দেখো। চাইলে রকিং চেয়ারটাতে উঠে বসো বা একটুকরো কাঠ দড়িতে বেধে ঝোলানো দোলনায় দোল খাও! প্রতিদিনই ঘন্টার পর ঘন্টা অনলাইন বাজারে পরে থেকে সে একটু একটু করে তার ঘরটা সাজায়!
মিনিট দশেক হয়ে গেলে অনামিকা উঠে পরে। এতোক্ষণে নিশ্চয়ই পানি গরম হয়ে গেছে। ভালোমতো একটা শাওয়ার নিয়ে নিজেকে একটা নাইট গাউনে ঢুকিয়ে নিল। স্টাডিতে ঢোকার আগে একমগ গাঢ় লিকারের চা তৈরি করে নেয়। সাথে মচমচে ভাজা দুটো ফ্রোজেন সিংগারা। একবাটি কাবুলি চানা সেদ্ধর ওপর কুচি করে কাটা গাজর, শশা, এডমন্ড ছড়িয়ে দিল। সব কিছু একটা বাঁশের ট্রেতে সাজিয়ে নিল। কি শান্তি! কি শান্তি!
কিন্তু অনামিকা জানে, সব দিনগুলো এমন যায় না। একেকটা দিন সকালে ঘুম ভেঙেই এক অসহ্য বিষন্নতা ঘিরে ধরে। এই এতো শখ করে সাজানো সবকিছু গিলে খেতে চায় তাকে। বিবাহিত ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বান্ধবদের মতো একটা বিবাহিত জটিল জীবনের জন্য মনটা অস্থির হয়। যে কোন রকমের একটা বিয়ে করে ফেলতে ইচ্ছা করে তখন। সিভি গুলো বের করে বসে। উল্টে পাল্টে দেখে। কিন্তু মেঘে মেঘে বেলা অনেক গড়িয়েছে। আর দিনে দিনে নিজের যোগ্যতা বেড়েছে, বেড়েই চলেছে। এখন তার সমকক্ষ অবিবাহিত পুরুষ মেলে না। মাঝে মাঝে ছাড় দিতে ইচ্ছা করে। মনে হয়, ঠিক আছে, ডিভোর্সি কাউকেই বেছে নেয়া যাক বা বয়সে ছোট কাউকে। অথবা, অবিবাহিত বয়স্ক, কিন্তু কম শিক্ষিত বা হয়ত তার চেয়ে ছোট কোন চাকরি করে! সেই রকম দিনগুলো কাটে ভূতে পাওয়া মানুষের মতো। নির্ঘুম রাত কাটে। তারপর আরেকটা ব্যস্ত সকাল আর সারাটা দিন তাকে আবার তার ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনে! তখন রাতের ভাবনাগুলো গায়ে কাঁটা দেয়। বিবাহিত জীবনের এতো এতো দায়িত্ব! মানিয়ে চলা! ভালো না লাগা অনেক কাজ, স্বভাব, ঘটনাকে মেনে নেওয়া!
স্টাডির ডিভানটাতে শুয়ে সে টিভিতে একটা মুভি চালিয়ে দিয়ে পরপর কয়েক চামচ চানা মুখে চালান করে দেয়। চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে পুরনো একটা শারদীয় সংখ্যা হাতে নিয়ে পাতা ওল্টায়। এই সময় মোবাইলটা বেজে ওঠে। হাতে না নিয়েই অনামিকা বুঝতে পারে কার ফোন। ধরবে না ধরবে না ভেবেও সে ফোনটা রিসিভ করে। একসময় আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করে আধঘন্টা ধরে তারা কথা বলছে। চোখ বন্ধ করে সে মনে করতে চেষ্টা করে কি নিয়ে কথা বলছে তারা। অবাক হয়ে দেখে, একটা কথাও কোন প্রয়োজনীয় কথা নয়। কিন্তু তবু কথার পিঠে কথা এসেই যাচ্ছে। অনামিকা সাবধান হয়। সে বলে, কাল অফিস আছে, এবার ঘুমতে হবে। বলে কথা শেষ করে।
টিভিটা বন্ধ করে দিয়ে সে নিজের বেডরুমে ফিরে আসে। মুখে খানিকটা রাতক্রিম ঘষতে ঘষতে আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করে, খানিকটা কি প্রশ্রয় দিচ্ছ না তুমি?
পাল্টা উত্তর আসে, প্রশ্রয় কেন বলছ?
: তুমি কি বলতে চাও, তার ঈঙ্গিত তুমি বুঝতে পারছ না?
– না, বুঝতে পারছি না। কিসের কথা বলছ?
: তোমার কি মনে হয় না, সে গল্পের ছলে তার দৃষ্টিভঙ্গী, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, ভালো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য কতোটা ছাড় সে দিতে রাজি এই সব তোমার সাথে একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে শেয়ার করছে?
– নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য? কি সেটা?
: যে কোন শর্তই সে মেনে নেবে। প্রয়োজনে ধর্মান্তরিত হবে। ফ্যামিলি রাজি না হলেও তার কোন অসুবিধা নাই। এমন কি সে একটা ভালোবাসার সম্পর্কে বিয়ে ব্যাপারটাকে তুচ্ছ মনে করে। এই সব গল্প তোমার সাথেই কেন করছে?
অনামিকা নিজের ভেতরে বাঁধভাঙার শব্দ টের পায়। কিন্তু সে মোটেই তার যুগের মতো অতোটা আধুনিক হয়ে উঠতে পারেনি। এখনও একটা জায়গায় সে পিছিয়ে আছে। সমাজে যে বিরাট পরিবর্তনটা তাদের যুগের মানুষেরা এনে দিল, সে নিজেকে তার অংশ হিসাবে দেখতে চায় না।
বিয়ে ব্যাপারটা তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বন্ধন মনে হয়। সে তার সময়ের মানুষের মতো এটাকে একটা দুজন মানুষের মধ্যে চুক্তি হিসাবে মানতে পারে না। তার কাছে বিয়ে মানে পরবর্তী প্রজন্ম। পরবর্তী প্রজন্ম মানে ভবিষ্যৎ পৃথিবী। বাসযোগ্য করে রেখে যাওয়ার কথা বর্তমানের মানুষদের।
বিশাল একটা ভ্যাকুয়ম তৈরি হতে চলেছে সামাজিক জীবনে। তার নিজের চেনা প্রচুর তরুণ তরুণী রয়েছে, যারা বিয়ে করতে চায় না। এদের আবার একটা অংশ লিভটুগেদারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। বেড়ে চলেছে অ্যাবরশনের পরিমাণ। আরেকটা অংশ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কাজটা করছে। এরা সিঙ্গেল মাদার হয়ে আধুনিকতা, গর্ভের সন্তানের প্রতি দায়িত্ব এইসব যুক্তি বা প্রবোধ দিচ্ছে নিজেকে, সমাজকে। কিন্তু গর্ভের সন্তানটা এইরকম একটা জন্ম চায় কিনা, সেটা তো তোমরা জানো না। জানো না, বাবা মায়ের বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কের ফসল হবার সাধ আদৌ সেই সন্তানের আছে কি! জানো না জন্ম পরিচয় ছাড়া বেড়ে উঠবার শখ তার আছে কিনা। জানো না, দুটো ভিন্ন ধর্মের বাবা মা কে নিয়ে, দুটো আলাদা ধর্ম বিশ্বাস থেকে কোনটা বেছে নেবে। এই সব তার মনোজগতে কতোটা চাপ হবে!
সমাজে তার মতো স্বচ্ছল, স্বাবলম্বী ছেলে বা মেয়ের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, বিয়ে করতে যারা ভয় পায়। বিবাহিত জীবনের দায়-দায়িত্ব তাদের ভীত করে তোলে। আজকাল ধুমধাম ডিভোর্সও হচ্ছে। স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে, বসে বসে মার খাওয়ার দিন এখন আর নাই। তখনও এরা সন্তানদের কথা ভাবছে না।
একটা মধ্যবয়সী জেনারেশন, যারা হয় অবিবাহিত নয়ত ডিভোর্সড। আরেকটা নতুন জেনারেশন, যারা ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান অথবা সিঙ্গেল মাদারস চাইল্ড।
এই স্রোত কোনভাবেই ঠেকানোর আর পথ নেই। একটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে সেখানের জনগণের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা। তার কারণেই অন্যায় কে না মেনে বিয়ে নামক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা বা ডিভোর্স, বার বার বিয়ে করা কিংবা লিভ টুগেদার, অ্যাবরশন, সিঙ্গেল প্যারেন্ট, ফ্রাস্টেড চাইল্ড, সুইসাইড, ড্রাগস, কিশোর অপরাধ…! সবকিছু একটা চেইনের অংশ।
তার ভেতরটা ছটফট করে! বুকে চাপ অনুভূত হয়! নিজেকে এই চেইনের একটা বিডস ভাবতে তার ভালো লাগে না! আবার সে সিভিগুলো হাতে নেয়! একটা স্বাভাবিক জীবনের জন্য কিছুটা ছাড়, কিছুটা মেনে নেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু হয় নিজের সাথে বোঝাপড়া!
আজ আর ঘুম হবে না। আগামীকালের সুর্য ওঠার অপেক্ষায় সে তাই ঝুল বারান্দার রকিং চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়!
















Leave a Reply