
শিল্পী সোহাগ পারভেজ
ফারিসা মাহমুদ (মুক্তমত): মাত্র ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দেশটার প্রাকৃতিক-বৈচিত্র্য অবাক করার মতো। মাথার ওপরে হিমালয় পর্বত… তো পায়ের দিকে বঙ্গোপসাগর। অন্যদিকে আছে শিরা-উপশিরার মতো অজস্র নদী। এই দেশের রূপ বৈচিত্র্য আর সৌন্দর্য বর্ণনা করা সহজ ব্যাপার নয়। পাহাড়, সাগর, নদী, হাওর, ঝর্ণা, সুফলা সমতল ভূমি… কী নেই! এদেশে সূর্য উদয় হয় সোনার রথে; চাঁদ উদয় হয় রুপোর রথে! এদেশের মানুষ চাঁদ-সূর্যকে আদর করে মামা ডাকে। কী যে কল্পনাপ্রবণ এই দেশের মানুষ! আর এর জনপদ ও তাদের জীবনযাপন সংস্কৃতিও যে কতো বৈচিত্র্যময়! আবার প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবন ও যাপন ওৎপ্রোতভাবে জড়িত।
এই যে অনন্ত সৌন্দর্যমণ্ডিত আমাদের বাংলাদেশ, এই যে ভিন্নচোখে অন্যচোখে মানুষ ও তার যাপনকে, আপন করে দেখা যায়, এসব বিষয়ই ছবিতে তুলে আনতে চেষ্টা করেছে শিল্পী সোহাগ পারভেজ। নানা মাধ্যমে, নানাবিন্যাস আর নানা আঙ্গিকের বহুমুখী ছবির অনন্য কল্পরূপ সোহাগের ছবিতে!
দীর্ঘদিনের পরিভ্রমণে আমাদের দেশের প্রকৃতি, মানুষ ও তাদের জীবনযাপন ঘুরে ঘুরে দেখেছেন সোহাগ। সেইসব অভিজ্ঞতালব্ধ যাপনচিত্র বাসা বেঁধেছে সোহাগের তুলিছোঁয়া আঙুলে! অবিরত তিনি কাজ করেছেন একজন দক্ষ শিল্পীর সবটুকু পেশাদারিত্ব নিয়ে! আমি ব্যক্তিগতভাবে আনন্দবোধ করি, শিল্পী সোহাগ পারভেজ-এর সঙ্গে সে সব আর্ট-ট্রিপের কয়েকটারই ভ্রমণসাথী হয়েছি! খুব কাছ থেকে দেখেছি কাজের প্রতি ওর একাগ্রতা, ও নিষ্ঠা। কত কত জায়গায় যে ঘুরে ঘুরে তিনি কাজ করেছেন! কখনও পাহাড়ি আদিবাসীদের গ্রামে, কখনও নদীর ধারে জেলেপাড়ায়, গ্রাম্য হাটে কখনো বা হাওরের ঢেউয়ের কাছে!
সাঁওতাল পরিবার, পালতোলা নৌকা, বুড়িগঙ্গা, পুরাতন ঢাকা, ইস্টিমার, ঝিল, বান্দরবানের সাঙ্গু নদী সহ বিভিন্ন শিরোনামে শিল্পীর প্রায় ৩ বছরের কাজ নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ঝকঝকে অ্যাক্রেলিকে বড়ো ক্যানভাস, স্বচ্ছ জলরঙ আর চারকোলে অদ্ভূত নিরিক্ষামূলক কাজ, পেনস্কেচ, পেনস্কেচ ও জলরঙ, এমন কিছু অসাধারণ ছবি স্থান পেয়েছে এই প্রদর্শনীতে।
সবগুলো ছবি প্রসঙ্গে বলা তো কঠিন।
আমি এইখানে দুইটা ছবি নিয়ে একটু বলি… সাধারণভাবে ছবি দেখে যে অনুভূতির জন্ম হয় তাই একটু লিখছি। প্রথম ছবিটা, সাদাকালো চারকোলে করা কাজ। মেঘ, নদী, পাল তোলা নৌকা ও গরু এসেছে বিষয় হিসেবে। কেবল মাত্র কালো চারকোলকে ব্যবহার করে অসাধারণ দক্ষতায় ছবিটার চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কালোর কয়েকটা গ্রেড, টেক্সচার এবং আলো… এই হচ্ছে ছবিটার যাদু।
দ্বিতীয় ছবিটার বিষয় পুরানো ঢাকার কয়েকশ’ বছরের পুরানো স্থাপনা। এইখানেও রঙের ব্যবহারে বাহুল্য নেই। পরিমিত রঙে আমাদের শত বছরের অতীত জীবন্ত হয়ে সামনে এসেছে। শিল্পী এই ছবিতে ধূসর ও কালো রঙে মানুষ ও জীবনযাপনকে ধরতে চেয়েছেন। আবার লালচে রঙে স্থাপনাকে হাইলাইট করেছেন।
সোহাগ ওর কাজে নিজস্বতার ছাপ খুব স্পষ্ট করে রাখেন। নিজস্ব একটা স্টাইল ও তৈরি করেছেন।
এইবার এক্সিবিশনে ওর সেই নিজস্বধারাকে ভেঙে নতুন এক ধারা তৈরির প্রবল চেষ্টাকে দেখেছি। নিজের কাজ নিয়ে নিরিক্ষা করা যেন নিজেরই নতুন স্বত্তা খুঁজে বেড়ানো। এই নিজেকে খোঁজার তৃষ্ণাই তাকে সোহাগ পারভেজ করে তুলেছে। অনন্য ও অসাধারণ করে তুলেছে।
১০ সেপ্টেম্বর বিকেলে গ্যালারি ‘কায়া’তে “my country” শিরোনামে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ছাড়াও দেশের শিল্পরসিক, শিল্প সমালোচক ও চারুকলার অসংখ্য ছাত্রছাত্রী উপস্থিত ছিলেন। জলরঙ, চারকোল, অ্যাক্রেলিক, পেন ও ড্রইং মাধ্যমে করা বিভিন্নরকম ৪২টি কর্মশিল্প স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।
আরও পড়ুন: ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নীতিমালার খসড়া সম্পন্ন
১৯৮১ সালের ৩১ ডিসেম্বরে কুষ্টিয়া শহরে জন্ম শিল্পী সোহাগ পারভেজের। হাসিখুশি শিশুসুলভ মানুষ। শিল্পীর ভিতরটা থাকতে হয় স্বচ্ছ, না হলে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে তা রঙে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। দেশের প্রতিশ্রুতিশীল
এই শিল্পী, একক প্রদর্শনী করেছেন ৮টি। আর্টক্যাম্প করেছেন ৪৫টিরও বেশি। দেশে এবং দেশের বাইরে তিনি গ্রুপ-প্রদর্শনী করেছেন প্রায় ৭৫টি। ভারত, পাকিস্তান , নেপাল, ভুটান, ফিলিপাইন, জাপান, দুবাই, চীন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশে তার দলবদ্ধ প্রদর্শনীও হয়েছে। সোহাগ পারভেজ তিন হাজারের বেশি বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন।
আরও পড়ুন: ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিককে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের আহ্বান
দেশপ্রেম হৃদয়ে লালন করে, বোধ ও চেতনার রঙ মনে মেখে, তুলি হাতে ছুটে চলা এক শিল্প-পরিব্রাজক সোহাগ পারভেজের মনন ও চিন্তার প্রতিচ্ছবি-যুক্ত এই প্রদর্শনী চলবে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
শিল্প ও সৌন্দর্যপ্রেমী যে কেউ ঘুরে আসতে পারেন সোহাগের শিল্পজগতে, বোধ-ভাবনা ও রঙের দুনিয়ায়!
লেখক পরিচিতি: ফারিসা মাহমুদ; চিত্র সমালোচক
আর্ট নিউজ ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে:














Leave a Reply